নদী-খাল নেই, তবু ১২ কোটি টাকায় সেতু নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২৬

সংগৃহীত ছবি

বর্তমানে স্থানটিতে নদী নেই, খাল-বিলও নেই; তারপরেও সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি মস্ত বড় সেতু। সেতুটি বাস্তবায়নে রয়েছে ফরিদপুর সড়ক বিভাগ।

‌এক সময় এখানে থাকা খালটির ওপরে একটি সেতু থাকলেও এখন সেই স্থানটিতে না আছে নদী-খাল, না আছে পানি। আশেপাশে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। এক পাশে ছোট্ট একটি ডোবা। তার ওপর মস্ত বড় সেতু নির্মাণ এক আজব কল্পনা যেন। স্থানীয়রা এর প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন না। তারপরও সড়ক বিভাগ বানিয়ে চলছে মস্ত বড় সেতু।

ফরিদপুরের গোয়ালন্দ-তাড়াইল আঞ্চলিক সড়কে সেতুটি নির্মাণ হচ্ছে। এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে একসময় ছোট বড় অনেক সেতু থাকলেও সে সেতুগুলো এখন সড়কটিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই (প্রয়োজন নেই বলে সেতু উঠিয়ে নেয়া হয়েছে)। তবে একটি সেতু নজর কেড়েছে নগরকান্দা উপজেলার এই মহাসড়কের কালীখোলা নামক স্থানে। নদী ছাড়া, খাল ছাড়া স্থানে পুরাতন ব্রিজ ভেঙে নতুন এক মস্ত বড় ব্রিজ তৈরি নিয়ে। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৪৪ মিটার সেতুটি বানাচ্ছে সড়ক বিভাগ। সেতুটির নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবরণ ট্রেডার্স লিমিটেড। যার স্বত্বাধিকারী মো. মাজেদ শেখ। ‌

স্থানীয় জনগণ জানেন না নদী-খাল না থাকা সত্ত্বেও সেখানে সরকারি টাকা নষ্ট করে কেন সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর প্রয়োজন এক সময় থাকলেও এখন আর এর প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন তারা।

ফরিদপুর সড়ক বিভাগের অফিস সূত্রে জানা গেছে, সড়ক বিভাগের অর্থায়নে ৪৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ ফুট চওড়া সেতুটি নির্মাণে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেতুটির পাইলিংয়ের কাজ চলছে। সেতুটি যেখানে নির্মাণ হচ্ছে এটি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কালিখোলা এলাকায়। এখানে এক সময় ভুবনেশ্বর নদী থেকে বের হয়ে আসা গোপালপুর শাখা খাল ছিল। বর্তমানে খালটি শুকিয়ে বিলীন হয়ে গেছে। সেই সময়ে চলমান খালের ওপরে এলজিইডি থেকে একটি সেতু তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্যের। সেতুটির প্রস্থ ছিল ১২ ফুট। সময়ের বিবর্তনে দুই পাশেই বাড়িঘর হওয়ায় বর্তমানে সেতুর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ওই এলাকায় বসবাসরত স্থানীয়রা বলছেন, দুই পাশে বাড়ি ঘর হওয়াতে এবং খাল বা নদী না থাকায় এখানে এই মুহূর্তে সরকারের এত বড় অংকের টাকা ব্যয় করে সেতু নির্মাণের কোন প্রয়োজন ছিল না। এই আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন স্থানে সেতু থাকলেও সেগুলো ভেঙে রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। এই সেতুটিও ভেঙে রাস্তা করে দিলে সরকারের অর্থ অপচয় হতো না।

Nagad

স্থানীয়রা আরও বলেন, সাধারণত সেতু নির্মাণ করা হয় পানিপ্রবাহ কিংবা যেখানে কোনো জলাশয় বা খাল-বিল এবং নদী-নালা থাকে। কিন্তু এই নির্মাণাধীন সেতুটির আশপাশে কোনো জলাশয় বা নদী নেই। আছে শুধু মানুষের বসবাস। স্থানীয়রা বলছেন, এ যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া অবস্থা।

স্থানীয় ফজলুল হক জানিয়েছেন, আমরা জানি সেতু মানে হচ্ছে জলাশয়ের ওপর দুটি পাড়ের সেতুবন্ধন। কিন্তু এখানে সেতুবন্ধন তো দূরের কথা, আশপাশে বাড়িঘর ছাড়া কিছুই নেই। এছাড়া দুই পাশেই বাড়িঘর হয়ে গিয়েছে। এখানে সেতুর কোনো প্রয়োজন ছিল না। এতে সরকারের বড় অংকের টাকা নষ্ট হচ্ছে।

আরেক গ্রামবাসী মো. তারা প্রামাণিক জানান, দুই পাশে বাড়িঘর হয়ে গেছে এখন আর এখানে ব্রিজের কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে একটি সময় এখানে ব্রিজের খুব দরকার ছিল। সে ব্রিজ কালের বিবর্তনে এখন আর প্রয়োজন নেই।

সেতুটি নির্মাণ কোম্পানির দায়িত্বে থাকা সাইট ইঞ্জিনিয়ার বাবু হোসেন জানান, ব্রিজটি ৪৪ মিটার দৈর্ঘ্যজুড়ে নির্মাণ হচ্ছে। তবে কী কারণে এখানে সেতু প্রয়োজন, তা তিনি বলতে পারেননি।

নদী-নালা কিংবা খাল না থাকা সত্ত্বেও ব্রিজ হচ্ছে কেন? প্রশ্ন করা হলে ওই সেতু অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) মো. জাহাঙ্গীর বলেন, আগে থেকেই এখানে ব্রিজ ছিল। এ কারণে আমরা প্রতিবেদন আকারে ঢাকায় পাঠানোর পর এটি পাস হয়ে আসে। যেহেতু এখানে ব্রিজ ছিল সেহেতু এখানে ব্রিজ তুলে ধরেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই স্থানে ব্রিজ প্রয়োজন নাই এটা আমরা লিখতে পারি না।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কাইমদ্দিন মন্ডল হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, কী কারণে ওখানে ব্রিজ হচ্ছে বুঝতে পারছি না। যখন খাল ছিল তখন ওখানে ব্রিজ প্রয়োজন ছিল। কালের বিবর্তনে ওই স্থানে এখন খাল নেই। কিন্তু সরকার কেন যে এখানে বীজ নির্মাণ করছেন ব্যাপারটি বুঝতে পারলাম না। ব্রিজগুলো হতে হলে আরো বেশি জরিপ করে তারপরে করা উচিত। এতে সরকারের বিপুল টাকা খরচ হচ্ছে। এটার প্রয়োজন ছিল না। সূত্র: এনটিভি