কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শুরুর দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি
দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে শুরুর দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। এ দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি।
স্মারকলিপিতে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরুর সরকারি প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতার অবসানে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভারপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মনোয়ারা বেগম স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ, মহাসচিব আবু তাহের চৌধুরী, যুগ্ম-মহাসচিব মো. কামরুল ইসলাম, বিশিষ্ট রাজনীতিক মিতুল দাশ গুপ্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডিজিএম একরাম হোসেন, সার্ক মানবাধিকারের বিভাগীয় মহাসচিব জাফর ইকবাল, শিশুসাহিত্যিক ও কবি তসলিম খাঁ, ফোরামের বোয়ালখালী উপজেলা শাখার সভাপতি আক্তার হোসেন নিজামী, পরিবেশকর্মী মাসুদ রানা, সংস্কৃতিকর্মী জসিম উদ্দিন চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী রোজী চৌধুরী, সাংবাদিক আবছার উদ্দিন অলি, নারীনেত্রী আফরোজা সুলতানা পূর্ণিমা, তাহেরা শারমিন, সাবরিনা আফরোজা, লায়ন অলি আহমদ পিন্টু, সাংবাদিক ইলিয়াছ রিপন, জসিম উদ্দিন, এ কে আজাদ, সমাজসেবী মাঈনুদ্দিন, আইটি বিশেষজ্ঞ আজমেরীসহ অন্যরা।
প্রতিশ্রুতির পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
স্মারকলিপিতে বলা হয়, একনেকে অনুমোদনের প্রায় দুই বছর পরও কালুরঘাট নতুন সেতু প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ ও মূল নির্মাণকাজে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
এরপর ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর একটি সংবাদমাধ্যমে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের ফোকাল পার্সন ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের মে-জুনের মধ্যে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে। বিস্তারিত নকশা করতে এক বছর সময় লাগবে এবং এরপর দরপত্র আহ্বান করে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৪ মে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন ও নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের দাবি, এসব ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পরও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় চট্টগ্রামবাসী হতাশ। দেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের পর তুলনামূলক কম সময়ে নির্মাণকাজ শুরু ও সম্পন্ন করার উদাহরণ রয়েছে উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও যথাযথ তদারকি থাকলে কালুরঘাট সেতু প্রকল্পেও দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরুর দাবি
স্মারকলিপিতে কালুরঘাট সেতু প্রকল্পকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা, বিলম্বের কারণ প্রকাশ এবং সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী তিন মাসের মধ্যে সেতুর দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম বলছে, কালুরঘাট নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল, কক্সবাজারের রেল যোগাযোগ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতায় নির্মাণব্যয় বাড়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ ও যানজট বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তদারকি, প্রকল্প বিলম্বের কারণ প্রকাশ এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নীরব হব না’
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কালুরঘাট নতুন সেতু বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে ফোরাম। তাদের দাবি, এটি কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়; দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কারণে কালুরঘাট সেতুর দাবি এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তারা বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে গাফিলতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তারা স্মারকলিপি দিয়েছেন। বিগত সরকার এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একনেকে অনুমোদনের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে বারবার স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছেও যথাসময়ে কাজ শুরুর আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখনো দৃশ্যমান কাজ শুরু না হওয়ায় আবারও স্মারকলিপি দিতে হয়েছে।
স্মারকলিপি প্রদান উপলক্ষে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন বলেন, “কালুরঘাট নতুন সেতুর স্বপ্নটি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো অবস্থাতেই নীরব হব না। আমাদের দাবি অরাজনৈতিক ও সামাজিক। চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা পূরণের জন্য গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণভাবে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ব্যানারে চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। আমাদের সচেতন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যতদিন না এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।”

