১৫ ফেব্রুয়ারির বিএনপি’র নির্বাচন এবং ইতিহাসের কালো অধ্যায়: বিপ্লব বড়ুয়া

বিপ্লব বড়ুয়াবিপ্লব বড়ুয়া
প্রকাশিত: ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, ১৫/০২/২০২২

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৬ সালের এই দিনে স্বৈরাচারের প্রতিভূ বিএনপি প্রহসনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে পুনরায় অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। তৎকালীন বিএনপি নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সকল বিরোধীদলের বর্জন ও প্রতিরোধের মুখে গায়ের জোরে লোক দেখানো নির্বাচন করে বিএনপি। কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ৪৮টি আসনে ভোট গ্রহণের আগেই ক্ষমতাসীন বিএনপি’র প্রার্থীরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়। নির্বাচনের পরিবেশ এতই গোলযোগপূর্ণ ছিল যে ১০টি আসনের ফলাফল নির্বাচন কমিশনে পৌঁছাতে পারেনি। বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এই নির্বাচনে বিএনপি প্রহসনের মাধ্যমে ৯৭ শতাংশ আসন দখল করে, বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ারে বসানো হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বঘোষিত খুনি ফ্রিডম পার্টির নেতা খন্দকার আব্দুর রশিদকে।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি’র স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের প্রকৃত চেহারা পুনরায় ফুটে ওঠে। বিএনপির শাসন আমলে নির্বাচনি সংস্কৃতি বরাবরই ছিল খুবই ভয়ংকর। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোতে হেডলাইন প্রচারিত হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ১০ শতাংশের কম ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। সে সময়ের মাগুরা ও মিরপুরের দুটি উপ-নির্বাচনেও সেটি প্রমাণিত হয়। ক্ষমতাসীন বিএনপি আসন দুটিতে তাদের দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় গ্রহণ করে। জনগণের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলে। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ওই নির্বাচন বয়কট করে। ফলে এটি স্বৈরাচারী এরশাদের শাসন আমলের ১৯৮৮-এর নির্বাচনের মতো আরও একটি ‘নামকাওয়াস্তে’ নির্বাচনে পরিণত হয়। বিএনপির প্রার্থীদের কোনও আসনে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না। ’৮৮-এর নির্বাচনের মতোই এতেও অংশ নেয় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক-রশিদের ফ্রিডম পার্টি, যাতে ফারুক রহমান ঢাকার রমনা আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়।

ইতোপূর্বে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংসদে সাংবিধানিক পরিবর্তন তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করে। ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে বিএনপি ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিরোধী দলীয় প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ওই নির্বাচনের আয়োজন দেখতে গিয়ে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ রউফ মাগুরা থেকে পালিয়ে আসেন, এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তখন খালেদা জিয়া এবং বিএনপির শীর্ষ নেতারা এ ধরনের কোনও বিল সংসদে উত্থাপন করতে বিরোধী দলকে সুযোগ দিতে রাজি হয়নি। আওয়ামী লীগ জনগণকে সাথে নিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকায় ২৮ ডিসেম্বর আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র পেশ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি স্পিকার তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণযোগ্য নয় বলে রুলিং দেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ জুন বিরোধী সংসদ সদস্যদের পর পর সংসদে ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতি পূর্ণ হয়। এতে সংসদে তাদের আসন শূন্য হবে কিনা এ নিয়ে বিতর্কে সরকারি দল ও স্পিকারের মাঝে মতদ্বৈধতা দেখা দেয়। ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই সংসদ সচিবালয় থেকে ৮৭ জন বিরোধী সংসদ সদস্যের আসন শূন্য বলে ঘোষণা করা হয়।

এছাড়া যে ৫৫ জন সংসদ সদস্য বয়কটকালে হাজিরা খাতায় সই করেছিলেন, তাদের সংসদ সচিবালয় থেকে চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, যেদিন তারা হাজিরা খাতায় সই করেছিলেন সেদিন বৈঠকে তারা উপস্থিত ছিলেন কিনা। সংসদ সদস্যরা এ চিঠির কোনও উত্তর দেননি। অবশেষে ৭ আগস্ট তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশন ১৪২টি শূন্য আসনে ১৭ সেপ্টেম্বর উপ-নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। পরে উপ-নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ১৫ ডিসেম্বর ধার্য করা হয়। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকার উপ-নির্বাচনে না গিয়ে হঠাৎ করে ২৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৮ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে তৃতীয়বারের মতো তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ দেওয়া হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। দেশের সব বিরোধী দল গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

বিরোধী দল সংসদ থেকে পদত্যাগ করার পরেও তৎকালীন সংসদ নেতা বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে কোনও আলোচনা করতে রাজি হননি। সে কারণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান ঢাকায় এসে মধ্যস্থতা করার মাধ্যমে নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করেও তৎকালীন বিএনপি সরকারের অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় দেশব্যাপী আন্দোলন আরও জোরদার হয়। ইতোমধ্যে সারাদেশে বিএনপি’র জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি’র একক সিদ্ধান্তে বিচারপতি এ কে এম সাদেকের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেকোনও মূল্যে অনুষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেয়। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন শুধু বর্জনই করেনি, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করতে রাস্তায় নামে।

এমনকি নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাদের কেউই তেমন প্রকাশ্যে কোনও প্রকার প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেননি। নির্বাচনের দিন অনেক জায়গায় ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ ভোটারদের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। সারাদেশের আপামর জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচন বর্জন করে। ১৫০ জন নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্বাচনের দিনেই ১২জন মৃত্যুবরণ করে এবং অনেক ভোটকেন্দ্র ছিল ভোটার বিহীন। বিভিন্ন কেন্দ্রে সিল মারার দৃশ্য পরদিন দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন পরবর্তীতে নিজে স্বীকার করেছেন যে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু ছিল না। দেশবাসী ঘৃণাভরে ওই একতরফা নির্বাচনি তামাশা বর্জন করে। নির্বাচন দেশে ও বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। ১৬ তারিখ থেকে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনগণ। জনগণের বাধার মুখে সরকার গঠন করে বিএনপি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি আব্দুর রশিদকে বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসিয়ে জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করা হয়। ফ্রিডম পার্টির থেকে নির্বাচন করানো হয় বঙ্গবন্ধুর খুনি শাহরিয়ার রশীদকে এবং বিএনপি তাকে কুমিল্লার একটি আসন থেকে জিতিয়ে আনে। নির্বাচন হয়েছিল ২৫২টি আসনে।

Nagad

শেষ পর্যন্ত কমিশন ২৪২টি আসনের নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পেরেছিল। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। বিএনপির প্রতি জনগণের ঘৃণা ও ক্রোধ বিস্ফোরিত হয় এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাদেশ। শাসকগোষ্ঠী বিএনপি সব দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবৈধ বিএনপি সরকারের পতনের লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ প্রতিষ্ঠা করে ‘জনতার মঞ্চ’। জনগণের ক্ষোভ ও ঘৃণা গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী খালেদা জিয়া সরকার এবং ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া সরকারের পতন ঘটে। সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার আপসহীন নেতৃত্বে বিজয় সূচিত হয় জনগণের।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগের উপস্থাপিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা এবং তা সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ ও সংসদে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের একটি সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হতো না।

দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে একসময় যেমন আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল, এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো তামাশার নির্বাচন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্প সময়ের সংসদ ও সরকার গঠনের এক জঘন্য নজির সৃষ্টি করেছিল।

লেখক: ব্যারিস্টার; দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

সারাদিন. ১৫ ফেব্রুয়ারি. আরএ