মন্ত্রিসভা রদবদলে কী বার্তা দিল সরকার

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৫৮ পূর্বাহ্, গাস্ট ২৩, ২০২৬

সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্তিতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও দপ্তর পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। কাজের গতি বাড়ানো, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, শূন্যপদ পূরণ, জোটসঙ্গীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস—এবারের রদবদলের মূল বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।

শুক্রবার নতুন সদস্যদের শপথের পর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন কয়েকজন সদস্য, একই সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি তথ্য মন্ত্রণালয়ে। তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন এখন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তার জায়গায় তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন ভোলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ।

এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকার রাজনৈতিক সমন্বয় এবং জোটের শরিকদের সরকারে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাজের গতি বাড়ানোর বার্তা

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৮০ দিন পর মন্ত্রিসভায় এ পরিবর্তনকে দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা পর্যালোচনার পরই এই পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

Nagad

সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী ফল দেখাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে—এমন বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে এবারের রদবদলে।

শূন্য পদ পূরণ

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের শূন্য পদে সাচিং প্রু জেরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদত্যাগ করার পর পদটি শূন্য ছিল।

এবারের রদবদলে বিভিন্ন কারণে শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় স্থবিরতা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। অন্যদিকে ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা বেগমকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রীকে পদোন্নতি এবং একজন পূর্ণমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করেছে যে, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব স্থায়ী নয়; কাজের প্রয়োজন, কর্মদক্ষতা ও সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে।

পররাষ্ট্রে বাড়ছে জনবল

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীর পাশাপাশি এখন দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন। উপদেষ্টার পদ থেকে হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শামা ওবায়েদ। সরকারের বৈদেশিক কূটনীতি আরও সক্রিয় করা এবং কাজের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অসুস্থ মন্ত্রীর পাশে প্রতিমন্ত্রী

ধর্ম মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে গাইবান্ধার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সারকে। ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতি ধরে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব

মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাসে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ড. আব্দুল মঈন খানকে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বড় মন্ত্রণালয় পরিচালনায় রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

আরও রদবদলের ইঙ্গিত

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের সম্প্রসারণই মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত বিন্যাস নয়। কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও রদবদল হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মন্ত্রণালয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গতি কম থাকবে কিংবা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় দুর্বল হবে, সেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারের সামনে এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সরকার যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দিয়েছে, তা হলো-দায়িত্বে থাকা মানেই পদে স্থায়ী থাকা নয়, কাজের দৃশ্যমান ফল দেখাতে হবে।

আগামী ছয় মাসে মন্ত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সরকারি পরিকল্পনাকে কতটা বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া যায়। আর সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক সমন্বয় ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসকে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে পরিণত করা। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়