মুক্ত মিরপুরে স্বস্তি, কত দিন থাকবে- অপেক্ষা মোহাম্মদপুর-আজিমপুরে

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:২৭ পূর্বাহ্, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের কয়েকটি এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পথচারীদের চলাচলে। দীর্ঘদিনের দখল, দোকানপাট ও পণ্যসামগ্রীর কারণে যেসব ফুটপাত দিয়ে হাঁটা কঠিন ছিল, সেগুলো এখন অনেকটাই চলাচলের উপযোগী। তবে এই স্বস্তি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অতীতে উচ্ছেদ অভিযানের পর আবারও ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে মিরপুরের সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি মোহাম্মদপুর ও আজিমপুরের দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাত কবে উদ্ধার হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটপাত কেবল সড়কের পাশের অবকাঠামো নয়; এটি নগরবাসীর নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের মৌলিক পরিসর। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, পণ্যসামগ্রী রাখা, যানবাহন পার্কিং এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার কারণে পথচারীদের সড়কে নেমে চলতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি যানজট ও নগরীর বিশৃঙ্খলাও তীব্র হয়। বিভিন্ন জরিপে ঢাকার ফুটপাতের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দখলে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। খবর আমাদের সময়ের।

রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান জোরদার করেছে। এরই মধ্যে মিরপুর-১০, মিরপুর-১, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের পর পথচারীদের চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে।

তবে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এ পরিস্থিতি ধরে রাখা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, উচ্ছেদের পর নিয়মিত তদারকি, দখলদারদের পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আবারও ফুটপাত দখল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে পরিকল্পিত হকার জোন গড়ে তোলা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাসহ নাইট মার্কেট চালু এবং সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ব্যবসার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে ফুটপাতের পাশে শোভাবর্ধক গাছ লাগানো, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বসার জায়গা, প্রতিবন্ধীবান্ধব চলাচলের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ফুটপাত মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হলে তা দখলমুক্ত রাখা সহজ হবে।

কেমন হওয়া উচিত ফুটপাত

Nagad

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও দখলমুক্ত। পর্যাপ্ত প্রস্থ, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের উপযোগী নকশা, যানবাহন থেকে নিরাপত্তা, ছায়াযুক্ত বসার জায়গা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, পানি নিষ্কাশন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগ, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের জন্য পৃথক জায়গা এবং স্পষ্ট নির্দেশক থাকা জরুরি।

এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ফুটপাত নিরাপদে হাঁটার উপযোগী হবে। পাশাপাশি ফুটপাত সচল থাকলে সড়কে পথচারীদের চাপ কমবে এবং যান চলাচলও তুলনামূলক স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা

শুধু হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট এলাকায় হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পথচারীদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও কোথাও সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট সড়ক যানবাহনমুক্ত করে হকার মার্কেট চালু করা হয়।

ঢাকার মিরপুরের ৬০ ফুট সড়কের আশপাশ, উত্তরার কিছু সড়ক, মতিঝিলের অফিসপাড়া, আজিমপুর ও মোহাম্মদপুরের নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে প্রস্তাব এসেছে। এতে হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ও হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফুটপাত দখলের পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে দখলদারদের পৃষ্ঠপোষকও বদলে যায়। ফলে উচ্ছেদের পর আবারও ফুটপাত দখল হয়ে পড়ে।

ফুটপাতের দোকানগুলোতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের সংযোগ কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, হকার উচ্ছেদ করেই ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। হকারদের পেছনে থাকা শক্তিকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যে এলাকার ফুটপাত দখল হবে, সেই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও বিদ্যুৎ অফিসকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, ফুটপাতকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। নগর কর্তৃপক্ষ যদি শুধু অর্থ আদায়ের কৌশল হিসেবে উচ্ছেদ অভিযান চালায়, তাহলে এর সুফল নগরবাসী কখনোই পাবে না।

জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় হকাররা

ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হকারদের জীবিকার প্রশ্নও। রাজধানীর অনেক মানুষ অল্প পুঁজি নিয়ে ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করে সংসার চালান। তাদের মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য এবং দোকানভাড়া বহনে অক্ষম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তবে জীবিকার প্রয়োজন দেখিয়ে জনসাধারণের চলাচলের পথ দখল করে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কারা, তাদের সংখ্যা কত এবং কোথায় বিকল্পভাবে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া সম্ভব—এসব যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এতে নাগরিকদের চলাচলের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা সম্ভব হবে।

মোহাম্মদপুর-আজিমপুরে কবে অভিযান

মিরপুরের পর মোহাম্মদপুরের ফুটপাত থেকেও অবৈধ হকারদের উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। গত ১০ অক্টোবর তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরের ফুটপাতও মিরপুরের মতো দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আজিমপুরে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট সময়সূচি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুর ও আজিমপুরের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, উচ্ছেদ কার্যক্রম যেন নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ না থাকে। দখলের কারণে যেসব সড়ক ও ফুটপাত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে দখলমুক্ত করা হোক। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কখন অভিযান হবে, তা আগাম জানানো হলে সাধারণ মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার সুযোগ পাবেন।

উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানো জরুরি

রাজধানীতে অতীতেও একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত নজরদারি ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক জায়গায় আবার দোকান বসানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযান চালিয়ে ফুটপাত ফাঁকা করার পর তা দখলমুক্ত রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

মিরপুর-১০ এলাকায় দখল ঠেকাতে ডিএনসিসি পর্যবেক্ষক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

মিরপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোতেও পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা, নিয়মিত নজরদারি এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নগরবাসীর প্রত্যাশা, মোহাম্মদপুর ও আজিমপুরসহ রাজধানীর সব এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত হবে এবং সেই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়