১০ পর্যটকের মৃত্যু, রিসোর্টের দুই মালিকের একজনের নাম নেই মামলায়

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৩ পূর্বাহ্, অক্টোবর ২১, ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রিসোর্টের দুই মালিকের মধ্যে একজনের নাম থাকলেও অন্যজনের নাম নেই। রিসোর্টের ওয়েবসাইটে দুজনকেই মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ফলে আসামি নির্বাচন ও তদন্তের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রিসোর্টটির ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। তবে উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় তানভীর সুলতান মিয়াকে আসামি করা হলেও নিয়াজ মোর্শেদের নাম নেই। মামলায় রিসোর্টের কয়েকজন কর্মচারীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আদালতের আইনজীবী সেজান এহসান মনে করেন, মামলায় আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রিসোর্টের দুই মালিকের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অন্যজনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

এ বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে একজন মালিকের নাম পাওয়ায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। এখন আরেকজনের নাম সামনে আসছে। আরও নাম পাওয়া গেলে সেগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। এখনও তদন্ত শেষ হয়নি।’

ওয়েবসাইটে দুই মালিক, মামলায় একজন

রিসোর্টটির ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ অংশে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের নাম ও ছবি রয়েছে। সেখানে তাঁদের মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। যৌথভাবে অতিথিদের স্বাগত জানানোর বক্তব্যও রয়েছে ওয়েবসাইটে। অন্যদিকে, মামলার এজাহার-সংক্রান্ত তথ্যে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী হিসেবে মো. তানভীর সুলতান মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনের নাম রয়েছে।

Nagad

গত ১৭ অক্টোবর উখিয়া থানায় মামলাটি করেন থানার উপপরিদর্শক আশিষ সূত্রধর। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ।

ওসি আতিকুর রহমান জানান, রিসোর্টের অন্য মালিকের ঠিকানা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর জানা ছিল না। গ্রেপ্তার ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান ওসি। ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে নথি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন

আইনজীবী সেজান এহসান বলেন, অগ্নিকাণ্ডে এত মানুষের মৃত্যুর পরও এজাহারে মালিকদের ভূমিকা ও কর্মীদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, ঘটনাটিকে শুধু অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না এবং পরিবেশগত বিধিবিধান মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

আইনজীবীটির ভাষ্য, এজাহার দেখে তাঁর মনে হয়েছে, কর্মীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আসামি করা হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, মালিকদের একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তদন্তে প্রকৃত দায়িত্ব নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। ৩৩৮ ধারায় রয়েছে গুরুতর আঘাতের অভিযোগ। একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৩৪ ধারাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সেজান এহসান বলেন, ৩০৪এ ধারায় এমন বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের কারণে মৃত্যু ঘটানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত, যা অপরাধমূলক নরহত্যার পর্যায়ে পড়ে না। অন্যদিকে, ৩০৪ ধারায় অপরাধমূলক নরহত্যার ক্ষেত্রে মৃত্যুর অভিপ্রায় বা মৃত্যু ঘটতে পারে—এমন জ্ঞান থাকার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ থাকার তথ্য ১১ জনের

শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগার পর সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ জন নিখোঁজ থাকার কথা প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। পরীক্ষার ফল পেতে কিছুদিন সময় লাগবে।

পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রিসোর্ট পরিচালনায় কার কী দায়িত্ব ছিল এবং অগ্নিকাণ্ডের জন্য কারও অবহেলা বা গাফিলতি দায়ী কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের মাধ্যমে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে যাঁদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র: বাংলাট্রিবিউন।