প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহন, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৫
শাহজালাল রোহান:
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে টিকে থাকতে হলে তরুণদের নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো নতুন প্রযুক্তিতে জ্ঞান অর্জন করা এখন সময়ের দাবি-এমনটাই বলছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, বেসিসের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর।
তিনি বলেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং এআই-নির্ভর পেশাগুলোতে ব্যাপক চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। এআই-এর এই যুগে সফল হতে হলে তরুণদের নিজেদেরকে ক্রমাগত আপডেটেড রাখতে হবে।
সম্প্রতি এই এফবিসিসিআইয়ের উপদেষ্টা ও পরিচালক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আলমাস কবীর-এর সাথে কথা বলেন সারাদিন ডট নিউজ। তিনি বর্তমানে আয়আল কর্প লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এবং গুলশান সোসাইটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার সাক্ষাৎকারের চৌম্বুক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছে সিনিয়র রিপোর্টার শাহজালাল রোহান।
সারাদিন ডট নিউজ: এআই আসার ফলে অনেক চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তরুণরা এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কী করবে?
সৈয়দ আলমাস কবীর: আমরা যখন আগে দেখেছি যে, প্রথম, দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় শিল্প বিপ্লবেও মেশিন কেবল আমাদের ম্যানুয়াল বা গায়েগতরের কাজগুলো রিপ্লেস করেছিল। কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে, যা এখন চলছে, কম্পিউটারগুলো রেপিটিটিভ কাজ তো করতে পারছেই, এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কাজও নিজে থেকে করতে পারছে। যেমন, একজন কেউ লোনের জন্য আবেদন করলে আগে ব্যাংকের দুই-তিনজন মানুষ তার ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করত। এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে এই কাজগুলো সহজে হয়ে যাচ্ছে। এতেই চাকরির ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সত্যি বলতে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলেছে যে, আগামী কয়েক বছরে ৯২ মিলিয়ন চাকরি ডিসপ্লেসড হবে, কিন্তু একই সময়ে ৭২ মিলিয়ন নতুন চাকরি তৈরি হবে, যা এখন আর নেই। তরুণদের প্রধান কাজ হচ্ছে তাদের দক্ষতা বাড়ানো। যদি তারা নিজেকে দক্ষ করে তুলতে পারে, তবে হতাশার প্রশ্নই আসে না। বরং, চাকরির সুযোগ তাদের পেছনে ঘুরবে। নতুন নতুন যে টেকনোলজি, যেমন ডেটা অ্যানালিটিক্স, ব্লকচেইন, এবং আইওটি—এগুলোতে তাদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এআই আসলে তাদের জন্য একটি ‘বর’ হিসেবে কাজ করবে, কারণ এটি তাদের কম সময়ে অনেক বেশি কিছু শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে।
সারাদিন ডট নিউজ: প্রযুক্তি, এআই, অটোমেশন—এগুলো চাকরির বাজারে কীভাবে প্রভাব ফেলবে?
সৈয়দ আলমাস কবীর: এগুলো চাকরির ধরণ পরিবর্তন করে দেবে। কোভিডের আগে ডেলিভারি ম্যানের মতো পেশাগুলো এত প্রচলিত ছিল না। এখন অনেক তরুণ সাইকেল নিয়ে খাবার, বই, প্যাকেজ ডেলিভারি করছে, যা একটি নতুন পেশা হিসেবে জীবিকা নির্বাহের দিগন্ত খুলে দিয়েছে। একইভাবে, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডেটা এথিসিস্টের মতো নতুন চাকরির রোল তৈরি হচ্ছে। এআই আমাদের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো করে দেবে, ফলে মানুষ আরও সৃজনশীল ও উচ্চ-পর্যায়ের কাজ করার সুযোগ পাবে।
সারাদিন ডট নিউজ: তরুণদের জন্য আগামী ৫-১০ বছরে কোন সেক্টরে সবচেয়ে বেশি চাকরির সুযোগ তৈরি হবে বলে আপনি মনে করেন?
সৈয়দ আলমাস কবীর: আগামী পাঁচ বছরে অনেক নতুন চাকরি তৈরি হবে। যেমন: ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং, এবং এআই প্রম্পট রাইটিংয়ের মতো ক্ষেত্রে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। যারা প্রম্পট এমনভাবে লিখতে পারবে যাতে এআই থেকে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায়, তাদের জন্য আলাদা চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হবে। এই ধরনের নতুন রোলগুলোতে যারা দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাদের জন্য নতুন সুযোগ আসবে।
সারাদিন ডট নিউজ: তরুণরা যদি হতাশায় ভোগে—আপনি তাদের কী বলবেন?
সৈয়দ আলমাস কবীর: হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। তরুণদের প্রধান কাজ হলো নিজেদের দক্ষতা বাড়ানো। যদি তারা ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং বা প্রম্পট রাইটিংয়ের মতো বিষয়ে দক্ষ হয়, তাহলে চাকরির জন্য তাদের হতাশ হতে হবে না। আমি মনে করি, এআই একটি সুবিধা, যা তরুণদের কম সময়ে অনেক বেশি জিনিস শিখতে সাহায্য করবে। তাদের ক্যারিয়ার অনেক বেশি উজ্জ্বল হবে এবং নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সারাদিন ডট নিউজ: সফল ক্যারিয়ার গড়তে কোন তিনটি বিষয় সবসময় মনে রাখা উচিত?
সৈয়দ আলমাস কবীর: সফল ক্যারিয়ার গড়তে তিনটি বিষয় মনে রাখা উচিত: ১. দক্ষতা বৃদ্ধি: নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। ২. নতুন সুযোগের দিকে নজর রাখা: নতুন নতুন কাজের ধরণ বা রোলগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। ৩. বিশেষজ্ঞতা অর্জন: একটি বা দুটি বিষয়ে এমনভাবে বিশেষজ্ঞ হতে হবে, যেন বিশ্বব্যাপী সেই কাজে আপনার দেশের নাম আসে।
সারাদিন ডট নিউজ: বাংলাদেশে সফটওয়্যার খাত বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?
সৈয়দ আলমাস কবীর: আমাদের সফটওয়্যার খাত প্রায় ২০-২৫ বছর আগে শুরু হলেও আমরা এখনো প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। এর প্রধান বাধা ছিল দক্ষ জনশক্তির অভাব। যদিও কিছু কোম্পানি আন্তর্জাতিক মানের কাজ করছে, যেমন ভিএলএসআই চিপ ডিজাইন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। সরকার যদি বিদেশি প্রজেক্টগুলোতে দেশীয় সফটওয়্যার এবং জনশক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে, তবে এই খাতের দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব। আমরা ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির কথা অনেক বছর ধরে বললেও এখনো আমরা ১-১.৫ বিলিয়নের মধ্যে ঘোরাফেরা করছি। বিশেষ করে গত দুই বছরে সরকারি হিসাবে সফটওয়্যার রপ্তানি কমেছে, কারণ আমাদের কিছু সাধারণ কাজ এখন এআই করে ফেলছে। তাই আমাদের উচিত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া, যাতে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদেরকে তুলে ধরতে পারি এবং আমাদের প্রতি ঘণ্টার কাজের চার্জ বাড়াতে পারি।