প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রধান বার্তা হলো-‘প্রফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অব কমান্ড’ ছাড়া সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্য বিনষ্টের তৎপরতা চললেও ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাহিনীর ওপর সর্বগ্রাসী আঘাত এসেছিল, যার পরিণতি দেশের মানুষের জানা।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে বুধবার (১০ জুন) সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় ২০২৫ সালে সুদানে শাহাদাতবরণকারী ছয় সেনাসদস্যের স্ত্রীর হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন। একই সঙ্গে ওই হামলাসহ বিভিন্ন মিশনে আহত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও সম্মাননা দেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কুশলবিনিময় করেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবস উপলক্ষে আমি সারাবিশ্বের সেইসব সাহসী শান্তিরক্ষীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যারা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আত্মত্যাগ করেছেন। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এ বছর যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, আজকের এ বিশেষ দিনে তাদের পরিবারকে সম্মাননা জানিয়ে আমি আমার বিশ্বাস থেকে একটি কথা বলতে চাই, শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে শহীদদের এই আত্মদান যুদ্ধবিরোধী শান্তিকামী মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের এ আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, শুধু মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বই নয়, জাতিসংঘের পতাকাতলে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো মূল্যে শান্তি রক্ষায় বদ্ধপরিকর।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা খুব সহজ ছিল না। শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তাঁদের এই মহান ও মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। পরিবার-পরিজন থেকে বহু দূরে থেকে প্রতিকূল পরিবেশে তাঁরা নিষ্ঠা, সাহস এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রধানমন্ত্রী শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে বলেন, “বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আপনাদের এই অবদানের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি জানান, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের দুই লাখেরও বেশি সদস্য বিশ্বের ৪৩টি দেশের প্রায় ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশনে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টি শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
নারী শান্তিরক্ষীদের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষাবাহিনীতে নারী সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই নতুনমাত্রা যোগ করেছে।’
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সদস্যদের নিষ্ঠা, কর্তব্যবোধ এবং সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের কারণেই বিশ্বমঞ্চে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার সুনাম ও অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আমাদের এ গৌরবের ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী একটি আস্থা ও নির্ভরতার নাম।’
সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সম্মান এবং সাহসের প্রতীক। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর একজন মেজর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমি বিশ্বাস করি, এই গৌরব এবং অহংকার অবশ্যই আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর জন্য অনন্ত প্রেরণার উৎস।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুতরাং, এই গৌরব যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেটি রক্ষা করা সশস্ত্রবাহিনীর কর্তব্য।’ বিভিন্ন সময়ে বাহিনীকে ঘিরে অপতৎপরতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ও বিদেশে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার নানা তৎপরতা ছিল। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এরপরও বিভিন্ন সময়ে নানারকম ঘটনায় সশস্ত্রবাহিনীর ঐক্য বিনষ্টের তৎপরতা চললেও ২০০৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সশস্ত্রবাহিনীর ওপর সর্বগ্রাসী আঘাতটি এসেছিল। সেই আঘাতটির ফলে বাংলাদেশে কি ঘটেছিল সেটি আমাদের সবার জানা।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রধান বার্তাটি হলো, ‘প্রফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অব কমান্ড’ ছাড়া সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধুই অতীতচর্চা নয়, বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে স্বমহিমায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এই দেশটা আমাদের সবার। আমরা দেশে কিংবা বিদেশে যেখানে যেই দায়িত্ব পালন করছি সেই দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করাই হোক আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার।”
বিশ্ব পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জ এখন অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর ভাষায়, “আমাদের ভবিষ্যৎ মিশনগুলো হতে হবে আরও আধুনিক, দূরদর্শী এবং প্রযুক্তিনির্ভর।
তিনি জানান, শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকার পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সব সময় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদার নীতিতে বিশ্বাস করে। সংবিধানে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের প্রতি যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, বাংলাদেশ তা বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব সময় শান্তি, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং মানবতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় থাকবে ইনশাল্লাহ।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক ও প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাদের অব্যাহত সমর্থন প্রশংসার দাবিদার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা তাঁদের আন্তরিকতা, কর্তব্যবোধ এবং পেশাদারত্বের গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শান্তিরক্ষা মিশনের প্রতিটি সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের প্রতিনিধি এবং দেশের মান-সম্মানের বাহক।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা একইভাবে দেশের সুনাম সমুন্নত রাখবেন।