প্রকাশিত: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারানোর পর নতুন এ আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এতে গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনটির খসড়া নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা অংশ নেন। খসড়া নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হয়। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে আরেকটি বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান ও উন্নয়ন সহযোগীদের মতামতও নেওয়া হবে।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও শাস্তির কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গুমের জন্য সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা আগের অধ্যাদেশে ছিল অনধিক ১০ বছর।
আইনের খসড়ায় গুম, গুমের কারণে মৃত্যু, আলামত নষ্ট, গোপন আটককেন্দ্র স্থাপন এবং গুমে সহযোগিতাকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে আদালতের মাধ্যমে তাঁর পরিবার ‘গুম সনদ’ নিতে পারবে। এ সনদের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার, সম্পত্তি বণ্টন, হস্তান্তর ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত কার্যক্রমে আইনি সুবিধা পাওয়া যাবে।
তদন্ত ব্যবস্থায়ও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। সরকারি সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে পরিকল্পিত, বিস্তৃত ও ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ গুমের ঘটনা তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। এরপরও তদন্ত শেষ না হলে আদালতকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। বিচার শেষ করার সময়সীমা রাখা হয়েছে ১২০ দিন। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে তিন দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্ধতিগত গুমের মামলায় আইসিটির তদন্তাধীন ভুক্তভোগীদের পরিবারের জন্য গুম সনদ দেওয়ার ক্ষমতাও আইসিটিকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের তদন্তাধীন মামলায় গুম সনদ দেবে বিচারিক আদালত।
একাধিক সূত্রের দাবি, বৈঠকে কেউ কেউ পৃথক আইন না করে বিদ্যমান দণ্ডবিধি সংশোধনের মাধ্যমে গুমের শাস্তি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। আবার কেউ হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সমন্বয় করে একটি সমন্বিত আইন তৈরির মতামত দেন। তবে আলোচনা শেষে গুমকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে পৃথক আইন প্রণয়নের দিকেই সরকার অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে নতুন আইনে গুম কমিশন রাখার কোনো প্রস্তাব নেই।
এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, গুমের তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একই বাহিনী দিয়ে তদন্ত করালে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সেটি অনুমোদন না হওয়ায় অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়। পরে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় সংশোধিত আকারে নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সূত্র: সমকাল