প্রকাশিত: ১১:৪০ পূর্বাহ্, জুলই ২০, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছিল দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত দিন। টানা সহিংসতা, প্রাণহানি ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সেদিন সারাদেশে কারফিউ জারি করে সরকার এবং মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আন্দোলনকারী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩৭ জন নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৪৮ জনে পৌঁছায়। অন্যদিকে বিএনপি দাবি করে, কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ২০ জুলাই থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে এবং সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়। প্রথম দফায় ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে ২০ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর ছিল। দুই ঘণ্টার বিরতির পর আবার কারফিউ শুরু হয়, যা ২১ জুলাই বিকেল পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
একই সময়ে টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চলাচলও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কারফিউ চলাকালে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে ডিএমপির বিশেষ কারফিউ পাস ব্যবহার করতে হয়।
২০ জুলাইও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, উত্তরা, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, বাড্ডা, রামপুরা, ভাটারা, ধানমন্ডি, আজিমপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব এলাকায় পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলি ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
মিরপুরে সংঘর্ষের সময় কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে জননিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আটকে পড়া পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষকে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত অভিযানে উদ্ধার করা হয়।
এদিন রাজধানীজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি ভবন, কারাগার, মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের যৌথ চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি র্যাবের হেলিকপ্টার টহলও অব্যাহত ছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল তৎপরতা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভীকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। একই সময়ে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আন্দোলনের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। বৈঠক শেষে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দাবি করেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক ও সমাধানযোগ্য।
সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় দাবি করা হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে আন্দোলনের সমন্বয়করা প্রকাশ্যে জানান, সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এসব ঘটনার দায় তারা নেবেন না।
২০ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে। কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধ এবং দেশজুড়ে সংঘর্ষ-সব মিলিয়ে দিনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।