Print

সারাদিন

২৪ জুলাই ২০২৪: চিরুনি অভিযান, গণগ্রেপ্তার ও কারফিউয়ের মধ্যেই আংশিক স্বাভাবিক হয় দেশ

প্রকাশিত: ১১:১৩ পূর্বাহ্, জুলই ২৪, ২০২৬

সারাদিন ডেস্ক

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনার পর ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ছিল উত্তেজনাপূর্ণ আরেকটি দিন। টানা পঞ্চম দিনের মতো সারা দেশে কারফিউ কার্যকর থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা শিথিল করা হয়। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘চিরুনি অভিযান’ অব্যাহত থাকে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালিত হয়।

সেদিন সারা দেশে আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় গ্রেপ্তার হন ৬৪১ জন। ১৭ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে সারা দেশে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজার। রাজধানীতে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৫৮ জন এবং চট্টগ্রামে ৭০৩ জন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ছিলেন।

তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছিলেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

পাঁচ দিন পর ফিরল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর ২৪ জুলাই রাতে পরীক্ষামূলকভাবে সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে মোবাইল ইন্টারনেট তখনও বন্ধ ছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণে মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলাচল বন্ধই রাখা হয়।

নিখোঁজ সমন্বয়কদের সন্ধান

Nagad
Nagad

সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের খোঁজ পাওয়া যায়। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর আসিফ ও আবু বাকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাদের চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল।

আরও চারজনের মৃত্যু, নিহতের সংখ্যা ছাড়ায় দুই শতাধিক

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

সেই সময় হাসপাতাল, নিহতদের স্বজন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সংঘর্ষে ২০১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

কারফিউ শিথিল, সীমিত পরিসরে সচল হয় জনজীবন

২৪ জুলাই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ তিন জেলায় কারফিউ শিথিল রাখা হয়। অন্যান্য জেলাতেও জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়।

সরকারি অফিস ও ব্যাংক চার ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে টহল অব্যাহত রাখে। কারফিউ শিথিল হওয়ায় রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু হয় এবং সদরঘাট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। ধীরে ধীরে অফিস-আদালত ও শিল্পকারখানায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করে।

বিদেশি কূটনীতিকদের পরিদর্শন

কোটা আন্দোলন চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে ৪৯টি দেশের মিশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে যায় সরকার। তাদের মধ্যে ২৩ জন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানান, কূটনীতিকদের মেট্রোরেল, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সড়ক ভবনসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখানো হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের প্রথম বৈঠক

১৬ জুলাই সংঘটিত প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন ২৪ জুলাই প্রথম বৈঠক করে। কমিশন গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে তথ্য আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরিকল্পনা জানায়।

এদিকে, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় নিহত আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থাকা মরদেহগুলো সেদিন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য

তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুষ্কৃতকারীরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। অন্যদিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জনমনে স্বস্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত কারফিউ বহাল থাকবে।

নরসিংদী কারাগার থেকে পালানোদের গ্রেপ্তার

নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই নারী জঙ্গি—ইশরাত জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ এবং খাদিজা পারভীন মেঘলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।

এ ছাড়া কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ২৯২ জন আত্মসমর্পণ করেন।

আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি

ইন্টারনেট চালু, কারফিউ প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে ২৩ জুলাই দুই দিনের আল্টিমেটাম দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একাংশ। একই সময়ে আরেকটি পক্ষ ২৫ জুলাই দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সেদিন প্রতিক্রিয়া জানায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। সংস্থাটির মুখপাত্র মেজর জেনারেল প্যাট রাইডার জানান, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

সেনাপ্রধানের বক্তব্য

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে যাবে।

স্থগিত থাকে ভর্তি ও সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা

চলমান পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। এর মধ্যে ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা, বিভাগীয় পরীক্ষা এবং নন-ক্যাডার নিয়োগের বিভিন্ন পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ছিল এমন একটি দিন, যখন একদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ও গণগ্রেপ্তার অব্যাহত ছিল, অন্যদিকে সীমিত পরিসরে জনজীবন স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছিল। একইসঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।