প্রকাশিত: ৬:০৮ অপরাহন, গাস্ট ৪, ২০২৬
তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক:
ফেসবুক আইডি হ্যাক, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি কিংবা অপতথ্য ছড়ানোর মতো সাইবার অপরাধের অভিযোগ এখন থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে জানাতে পারবেন নাগরিকেরা। অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এবং নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকছে নতুন এই ব্যবস্থায়।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির (এনসিএসএ) অধীনে চালু করা হয়েছে সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম (সিআইআরএস)। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি বিভাগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্ল্যাটফর্মটির উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানাতে ভুক্তভোগীদের একাধিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এবং পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
এ ছাড়া কোন ধরনের সাইবার অপরাধ বেশি ঘটছে, কোথায় ঝুঁকি বাড়ছে এবং অপরাধের নতুন প্রবণতা কী—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করাও সহজ হবে।
যেভাবে মিলবে সেবা
সিআইআরএস একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। report.ncsa.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা সাইবার সংক্রান্ত ঘটনার অভিযোগ জানাতে পারবেন।
এই প্ল্যাটফর্মে হ্যাকিং বা অননুমোদিত প্রবেশ, সাইবার প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি, গুজব বা অপতথ্য ছড়ানো, তথ্য ফাঁস, অনলাইন পরিচয় চুরি এবং ক্ষতিকর কনটেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের ঘটনার অভিযোগ করা যাবে। অভিযোগ করার সময় ঘটনার বিবরণ, ঘটনার সময়, ক্ষতির ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া যাবে। পাশাপাশি স্ক্রিনশট, ছবি, নথি এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংকও যুক্ত করার সুযোগ থাকবে।
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সিস্টেম থেকে একটি ইউনিক কমপ্লেইন্ট আইডি তৈরি হবে। এই আইডির মাধ্যমে অভিযোগকারী পরবর্তী সময়ে নিজের অভিযোগের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। অভিযোগটি যাচাই হয়েছে কি না, কোন পর্যায়ে রয়েছে বা নিষ্পত্তি হয়েছে কি না-সব তথ্য অনলাইনে দেখা যাবে।
উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে সমাধান
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথমে উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তা যাচাই করবেন। প্রয়োজন হলে অভিযোগকারীর কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য নেওয়া হবে। উপজেলা পর্যায়ে সমাধান সম্ভব না হলে অভিযোগ জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে। আর জটিল বা জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কোনো ঘটনা সরাসরি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিতে পাঠানো হবে।
সেখানে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই, বিশ্লেষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো, প্রতিক্রিয়া, পর্যবেক্ষণ ও নিষ্পত্তির ধাপে সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা তদারকিতে যুক্ত হবে বিভিন্ন সংস্থা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা নির্ধারিত অনুমোদনের মাধ্যমে সিস্টেমের সারসংক্ষেপ, পরিসংখ্যান ও সাইবার ঝুঁকির প্রবণতা দেখতে পারবে। এর ফলে জাতীয় পর্যায়ে সাইবার ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরাপত্তা তদারকি আরও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একই অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করা হয়েছে ন্যাশনাল আইসিটি অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি রেটিং সিস্টেম (এনআরএস)।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে এই ব্যবস্থা। চারটি প্রধান স্তম্ভ ও ১৩১টি মূল্যায়ন সূচকের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ থেকে ই পর্যন্ত গ্রেড দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও ডিজিটাল সেবার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এনআরএসের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা চিহ্নিত করা, নিরাপত্তা অডিটের প্রয়োজন নির্ধারণ এবং সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সাইবার ঘটনা প্রতিবেদন ব্যবস্থা (সিআইআরএস) এবং জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা রেটিং ব্যবস্থা (এনআরএস) চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সিআইআরএসের মাধ্যমে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান সহজে সাইবার ঘটনার অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রী বলেন, এনআরএস সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা মূল্যায়ন ও উন্নয়নে সহায়তা করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অপপ্রচার ও অনলাইন হয়রানি রোধে সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আস্থাশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নতুন উদ্যোগগুলো দেশের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশ সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার নতুন যাত্রা শুরু করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও নগদবিহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে হলে সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিক, বেসরকারি খাত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব।
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ভবিষ্যতে সাইবার ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.), বিভিন্ন অংশীজন এবং আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা।