প্রকাশিত: ৯:০৪ পূর্বাহ্, গাস্ট ১৫, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরই মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি।
রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়। কর ফাঁকি শনাক্ত, বকেয়া রাজস্ব আদায়, মামলায় আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), দ্রুত অডিট নিষ্পত্তি, ভ্যাট ফাঁকি রোধ, উৎসে কর তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কর ফাঁকি শনাক্ত ও বন্ধের ওপর। মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ‘টিম এনবিআর’ ধারণায় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছে সংস্থাটি।
ভ্যাটে বাড়তি ৩৮ হাজার কোটি আদায়ের লক্ষ্য
এনবিআর সূত্র জানায়, ভ্যাট খাতে মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন করে এবং ফাঁকির ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আনা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট প্রদানকারী প্রায় দুই হাজার বড় করদাতার ওপর পৃথক নজরদারি চালিয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শুধু ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত করেই অতিরিক্ত প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নিয়েছে এনবিআর। এর বাইরে তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি, বকেয়া রাজস্ব থেকে ১৪ হাজার কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি থেকে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি।
উৎসে কর তদারকিতে বাড়তি ক্ষমতা
রাজস্ব আদায়ের অন্যতম বড় উৎস উৎসে কর বা টিডিএস। এ খাতে ফাঁকি বন্ধে গত ১৯ জুলাই এনবিআর জানায়, কর্মকর্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবেন।
প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদসহ অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করা যাবে। কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে থাকা তথ্যও যাচাই করা যাবে। প্রয়োজন হলে নথি বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড সাময়িকভাবে জব্দ করার ক্ষমতাও রয়েছে কর্মকর্তাদের।
সরেজমিন পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি নতুন কোনো ক্ষমতা নয়; আইনে আগে থেকেই থাকা ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। যারা উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না বা তথ্য গোপন করছেন, তাদের শনাক্ত করাই এর উদ্দেশ্য।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অটোমেশন ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে। বিজিএমইএ, ঢাকা চেম্বারসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন এনবিআরের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
আদালতে আটকে ৮২ হাজার কোটি
রাজস্ব বাড়ানোর আরেকটি বড় উৎস হিসেবে আদালতে আটকে থাকা বকেয়া রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আদালতে মামলা চলায় প্রায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা রাজস্ব আটকে আছে।
এর মধ্যে আয়কর খাতে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি, ভ্যাটে ৩৬ হাজার ২০০ কোটি এবং শুল্ককর খাতে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা রয়েছে। চলমান মামলার সংখ্যা আয়কর খাতে প্রায় ৫ হাজার ৫০০, ভ্যাটে ১১ হাজার ৬৮৪ এবং শুল্ককর খাতে ১২ হাজার ৩৩৫টি।
দীর্ঘদিন ধরে এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর, বুক অ্যাডজাস্টমেন্ট, প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং সার্টিফিকেট মামলা করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট বড় মামলাগুলো দ্রুত শুনানির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদালতের কার্যতালিকায় নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০টি বড় মামলার তালিকা করা হয়েছে। এসব মামলার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত।
৬৬ হাজার করদাতার অডিট নিষ্পত্তির উদ্যোগ
রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের অডিট জটও গুরুত্ব পাচ্ছে। এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রায় ৬৬ হাজার করদাতার অডিট দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে রাজস্ব জড়িত ২৩টি বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে সরকারের পাওনা নির্ধারণ ও আদায় দ্রুত হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা কর বিরোধও নিষ্পত্তি হবে বলে মনে করছে এনবিআর।
তামাক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নজরদারি
রাজস্ব ফাঁকি রোধে তামাক খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করা এবং কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা করছে এনবিআর।
এর মাধ্যমে উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য আরও কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনা এবং অবৈধ উৎপাদন বা রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এদিকে শুল্ক ফাঁকি রোধে অভিযান জোরদার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন শুল্ক স্টেশনে সাম্প্রতিক সময়ে সোনা, মূল্যবান ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, জামা-কাপড় ও প্রসাধনী জব্দ করা হয়েছে। শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এসব পণ্যের মূল্য প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য
সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে সামগ্রিক রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ অনুপাত ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ রয়েছে।
এনবিআরের নিজস্ব কর রাজস্ব জিডিপির ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
হয়রানি নয়, অটোমেশনের পরামর্শ
রাজস্ব বাড়াতে সরকারের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, করব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে কর ফাঁকি কমার পাশাপাশি কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগও কমবে। এতে হয়রানি, ঘুস ও অনিয়মের সুযোগ সীমিত হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, টিডিএস বিষয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—দুপক্ষেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণও এখনো তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআর কর্মকর্তাদের বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ায় হয়রানি ও দুর্নীতির আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, কর ফাঁকি ধরার আরও অনেক আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে। দোকানে গিয়ে কম্পিউটার বা নথি জব্দ করা কিংবা স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করা উচিত হবে না। এতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হতে পারে, যা সরকারের জনপ্রিয়তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা গেলে বর্তমান সংগ্রহ অন্তত দ্বিগুণ করা সম্ভব। এজন্য পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, রাজস্ব আহরণে নেওয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তা যেন হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং অটোমেশনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সব মিলিয়ে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর এখন কর ফাঁকি বন্ধ, বকেয়া আদায়, মামলা ও অডিট জট নিরসন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অটোমেশন এবং করদাতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর। সূত্র; জাগো নিউজ