প্রকাশিত: ১১:৪০ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ফের তীব্র হয়েছে। দুই দেশ এবার সমুদ্রপথে পরস্পরের সংশ্লিষ্ট জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের মধ্যে শনিবার এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর মধ্যে খার্গ দ্বীপের কাছে একটি ট্যাংকারসহ দুটি জাহাজকে ‘স্থায়ীভাবে অকার্যকর’ এবং ওমান উপসাগরে থাকা আরেকটি জাহাজকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও মার্কিন হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তিনটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আরও তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করে।
আইআরজিসির দাবি, তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে ‘অননুমোদিত’ একটি রুট ব্যবহার করছিল। ভবিষ্যতে ওই রুট ব্যবহার না করতে অন্য জাহাজগুলোকেও সতর্ক করেছে ইরান।
এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, ইরানের হামলার লক্ষ্য ছিল দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ—একটি বিমানবাহী রণতরী ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। তবে জাহাজ দুটি আইআরজিসির একাধিক হামলা এড়িয়ে গেছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি বলে দাবি করেছে সেন্টকম।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, হামলার শিকার তিনটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকার আইআরজিসি ও এর আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বহু বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিব জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলার শিকার ট্যাংকারটিতে কোনো হতাহত হয়নি। খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল। দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়।
ওমান উপসাগরে হামলার শিকার অপর দুটি ট্যাংকারের ক্রুদের লাইফবোটে করে তীরে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইরিব। তাদের একটি খালি ছিল এবং অন্যটিতে তেল ছিল বলে জানানো হয়েছে।
পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, আইআরজিসি ওই অঞ্চলের আরও ছয়টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার এবং বাকি তিনটি বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকেই জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি এখনো ‘খোলা’ রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা করছে। তবে ওই বিকল্প রুট ব্যবহারকারী জাহাজও এর আগে ইরানের হামলার শিকার হয়েছে।
শনিবারের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরান মার্কিন জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস ও ডুবিয়ে দেবে।
এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করে। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন স্থাপনে ব্যবহার করা হতে পারে—এমন দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করতেই ওই হামলা চালানো হয়। পরে মঙ্গলবার ট্রাম্প আরও একটি ‘খুব বড় হামলার’ কথা জানান এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে দাবি করেন।
এরপর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা নিয়ে বিতর্ক
এদিকে দক্ষিণ ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার ইরানি দাবিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ছিল বলে দাবি করেছে তেহরান।
তবে বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই হামলার দাবির বিষয়ে ‘চরম সংশয়’ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার সিরিক শহরে একটি বাড়িতে আয়োজিত বিয়ের অনুষ্ঠানে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো আঘাত হানে। তেহরান ঘটনাটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।