Print

সারাদিন

ছবি হাতে মায়েদের আকুতি-‘সন্তানকে খুঁজে দিন’

প্রকাশিত: ৭:৫৮ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

সারাদিন ডেস্ক

‘এক বছর ধরে আমার মেয়ে নিখোঁজ। খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা আমার সন্তানকে খুঁজে দিন।’-নিখোঁজ শিশু রূপা আক্তারের ছবি হাতে কাঁদতে কাঁদতে এ আকুতি জানাচ্ছিলেন তার মা স্বপ্না আক্তার। সন্তানের সন্ধান চেয়ে তার মতো অন্তত ৩০টি পরিবারের মা-বাবা ও স্বজন রোববার ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হাজির হন।

‘আমার সন্তান কোথায়?’ শিরোনামে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে স্বজনেরা নিখোঁজ সন্তানদের ছবি ও নিখোঁজ হওয়ার তারিখ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নেন। সন্তান হারানোর কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা সন্তানদের দ্রুত খুঁজে বের করতে সরকারের হস্তক্ষেপ এবং নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ টিম গঠনের দাবি জানান।

এক বছর ধরে মেয়ের অপেক্ষায়

স্বপ্না আক্তার জানান, গত বছরের ২৯ আগস্ট বাসার কাছে একটি দোকানের সামনে থেকে তিন বছর বয়সী রূপা নিখোঁজ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে এক তরুণকে রূপাকে নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, এখনো মেয়ের সন্ধান মেলেনি।

স্বপ্না বলেন, ‘মেয়ে বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, সেটাও জানি না। কিন্তু মেয়েকে পাওয়ার আশা একমুহূর্ত ছাড়তে পারি না। মৃত্যুর আগে একবার হলেও সন্তানকে দেখে যেতে চাই।’

Nagad
Nagad

২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থেকে আট বছর বয়সী শিশু সকাল নিখোঁজ হয়। জিডি করেও সন্তানের সন্ধান পাননি বাবা ইসমাঈল হাসান। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রশাসনের কাছ থেকেও যথাযথ সহযোগিতা পাননি তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসমাঈল বলেন, ‘ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছি। মৃত্যুর আগে একবার সন্তানকে দেখতে চাই।’

‘আমার সন্তানকে চাই’

রাজবাড়ীর পাংশায় স্কুলে যাওয়ার পথে গত বছরের ২০ মে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. তামিম ওরফে আবদুল্লাহ (১৫) নিখোঁজ হয়। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় যা কিছু করার করেছেন। তিনি সবার কাছে সন্তানের সন্ধান চেয়েছেন।

ঝিনাইদহের খাজুরা থেকে গত ২৯ জুলাই নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী মো. আলী। তার বাবা মোহাম্মদ হোসেনের অভিযোগ, জিডি করতে গিয়ে পুলিশের অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। বিভিন্ন জেলায় খুঁজেও ছেলের সন্ধান পাননি তিনি।

সাভারের বলিয়াপুর থেকে ৩৮ দিন আগে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছর বয়সী যাদব কর্মকার। তার মা অর্চনা রানী দাস বলেন, ‘আমি আমার বাচ্চাকে চাই। এই বাচ্চা ছাড়া আমি বাঁচব না।’

নবাবগঞ্জের দোহারে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দুই বছরের ছেলে মো. তোহা আদনানকে একটি কক্ষে রেখে পাশের ঘরে যান তহুরা ইসলাম। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন, ছেলে নেই; বিছানায় পড়ে আছে মুঠোফোন। এক মাস ২০ দিন ধরে নিখোঁজ ছেলেটির সন্ধান এখনো মেলেনি।

আড়াই বছর আগে বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় শিশু সামিয়া। তার মা চম্পা বেগম প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। পরে ওই ব্যক্তি জামিনে বেরিয়ে আসেন। ছয় মাস আগে টিকটকে একটি শিশুকে দেখে সামিয়া বলে শনাক্ত করে যশোরে গিয়ে খোঁজ নেন তিনি। তবে পুলিশের সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন চম্পা।

দিনাজপুরে গত বছরের মে মাসে বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয় মানতাশা (৮)। তার বাবা মনিরুজ্জামান মনির জানান, মুক্তিপণের টাকা দেওয়া হলেও মেয়েকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি জিডি

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শিশু নিখোঁজের অভিযোগে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ। বাকিদের উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়।

১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ চালুর দাবি

অনুষ্ঠানে জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের পর নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে বাংলাদেশে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’ (মুন অ্যালার্ট) ও টোল হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর পাইলট কার্যক্রম চালু করা হয়।

অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত, শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ টিম গঠনেরও দাবি জানান স্বজনেরা।