প্রকাশিত: ৭:২৭ অপরাহন, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশের এমন দাবির সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
এর আগে রোববার কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাঁকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
পুলিশের এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কুবির শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে অপ্রতিমের বাবা সদর দক্ষিণ থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখিয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ—পুলিশের এমন বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জীবনযাপন, তাঁদের কাছে থাকা দামি মুঠোফোন ও মোটরসাইকেলের বিষয়গুলোও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। গ্রেপ্তার তুহিনের বিরুদ্ধে আগে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এসব বিষয়ের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সামনে আনতে হবে।
আবুল বাশার বলেন, ‘আমরা হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাই। অপ্রতিম হত্যার কারণ তাঁর মা নাহিদা বেগমকে জানানো প্রয়োজন।’
শিক্ষার্থী ও ছাত্র অধিকার পরিষদের মহানগর সভাপতি সাইফ হোসেন বলেন, অপ্রতিমের বয়স ১৩ বছর। গ্রেপ্তার দুই কিশোরকে বয়সের কারণে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথভাবে বয়স যাচাই ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের বাইরে আরও কিছু তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে এক কিশোরের বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। সেই বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে পুলিশ এর আগে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াকেই হত্যার কারণ হিসেবে জানিয়েছিল।
এ ছাড়া অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোরকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। ওই ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত যোগসূত্রের কথা তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
গত শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন কুবির অদূরের লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে অপ্রতিমের আইফোনের ক্ষুদে বার্তা ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তুহিন (১৯), ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর এবং মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে সিয়াম ছাড়া অপর তিনজন রোববার রাতে কুমিল্লার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।