প্রকাশিত: ১০:৪৪ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের পর বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় না থাকায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও জটিলতা।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্মের দাবি, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ২ হাজার ২০০-এর বেশি। তবে সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত চার কারণে প্রার্থীদের নাম নিয়োগের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে—পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়া, ডোপ টেস্টে সমস্যা, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা এবং শিক্ষা সনদে গরমিল। এর মধ্যে নেতিবাচক যাচাই-বাছাই প্রতিবেদনের সংখ্যাই বেশি বলে জানা গেছে।
তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, নিয়োগপত্র নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পুনর্যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় আবার যাচাই করতে হবে। তথ্যগত ভুল বা অসংগতির শিকার প্রার্থীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ও প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থাও চেয়েছেন তারা।
কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তার গাফিলতি, ভুল তথ্য কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন করে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রার্থীদের দাবি, তারা অযোগ্য বা অনিয়মকারী কারও নিয়োগ চান না। যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য কারণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চান। অন্যদিকে মন্ত্রণালয় বলছে, ভেরিফিকেশন নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়মিত অংশ এবং নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
১৫ জেলায় ৩৫১ জনের তথ্য
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত সহকারী শিক্ষকদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হলে কয়েকটি জেলার প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, চূড়ান্ত ফলাফলে নাম থাকা সত্ত্বেও নিয়োগপত্রের তালিকায় তাদের নাম নেই।
প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, কুষ্টিয়ায় ১৬ এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জেলার তথ্য যোগ করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫১। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নয়; অন্যান্য জেলাতেও বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরে শত শত প্রার্থী নিয়োগের দাবিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
খুলনায় সুপারিশ পাওয়া ৬৯ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। সুনামগঞ্জে বাদ পড়েছেন ১২০ জন, মৌলভীবাজারে ৬৭ জন এবং নাটোরে প্রতিবন্ধীসহ ৩৪ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি। খুলনায় ২৭৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন এবং ৬৯ জন পাননি।
সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারে ৩৪৭ সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ৬৭ জন এবং যশোরে ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের যোগদান ও পদায়নের জন্য ১ অক্টোবরকে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচিত শিক্ষকদের ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের পর ৪ অক্টোবর পদায়নের আদেশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে তাঁর বিষয়টি পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। তবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর কেন অনেকের নাম বর্তমান নিয়োগপত্রের তালিকায় নেই এবং ভেরিফিকেশনে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সূত্র: সমকাল