Print

সারাদিন

সাইবার আইনের খসড়ায় সাংবাদিকদের উদ্বেগ কেন

প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহন, অক্টোবর ৪, ২০২৬

সারাদিন ডেস্ক

প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর কয়েকটি ধারা সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক, মানহানি ও বুলিং, গুজব ও ভুল তথ্য, এবং ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা নিয়ে সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

খসড়ার ৮(২) ধারায় শুধু প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, সম্ভাব্য আশঙ্কার ভিত্তিতেও অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও এর আওতায় আসতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৫ ধারায় মানহানি ও বুলিং

খসড়ার ২৫ ধারায় অনলাইন যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি ও শিশু যৌন নির্যাতনের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানহানি, অপমান, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিং যুক্ত করার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

আইন ও মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট বলেছে, বুলিংয়ের সংজ্ঞা ও পরিধি অতিরিক্ত বিস্তৃত হলে রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গ, ভোক্তার অভিযোগ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও ভিন্নমতের বৈধ প্রকাশও এর আওতায় পড়তে পারে। সংগঠনটি ধারা ২৫ থেকে মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার বিষয় বাদ দেওয়ার পাশাপাশি বুলিংয়ের অপরাধকে গুরুতর, ইচ্ছাকৃত ও ধারাবাহিক ডিজিটাল হয়রানি, হুমকি বা নির্যাতনের মধ্যে সীমিত করার সুপারিশ করেছে।

২৬(ক) ধারায় গুজব ও ভুল তথ্য

Nagad
Nagad

প্রস্তাবিত ২৬(ক) ধারায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ‘গুজব’, ‘ভুল তথ্য’, ‘ভুয়া খবর’ বা ‘বিভ্রান্তিকর তথ্যের’ মতো শব্দের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্লাস্টও বলেছে, যাচাই না করা তথ্য মানেই মিথ্যা তথ্য নয়। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতি বা দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার সময় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নাও হতে পারে। এ কারণে সংগঠনটি ২৬(ক) ধারা বাতিলের সুপারিশ করেছে।

সাংবাদিকের ডিভাইস তল্লাশি নিয়ে উদ্বেগ

খসড়ার ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও সাংবাদিকদের উদ্বেগের কারণ।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনেক সময় গোপনীয় সূত্রের কাছ থেকে তথ্য নিতে হয়। সাংবাদিকের ফোন, কম্পিউটার বা নেটওয়ার্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রবেশের সুযোগ থাকলে এসব সূত্র পরিচয় প্রকাশ বা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রস্তাব

খসড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচারের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিচার হলে সরকারের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব তৈরির সুযোগ থাকতে পারে।

তবে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হবে না বলে সরকার ইতোমধ্যে আশ্বাস দিয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত আইন কোনোভাবেই দমনমূলক আইনে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যাতে এর শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সময়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে খসড়া পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়।

সাংবাদিকদের মধ্যে সেলফ-সেন্সরশিপের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে এবং কঠোর শাস্তির বিধান থাকলে সাংবাদিকদের মধ্যে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় তৈরি হতে পারে। এর ফলে অনুসন্ধানী ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতায় আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও খসড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে এক আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও প্রতিটির জন্য যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সরকার বলছে, খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করা হচ্ছে। জুলাইয়ে খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।