Print

সারাদিন

আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পথে হাঁটছে সরকার: হাসনাত আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত: ৯:১৮ অপরাহন, অক্টোবর ১৩, ২০২৬

সারাদিন ডেস্ক

বিএনপি সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, সরকারকে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই গাড়ির চাকা ও ইঞ্জিন নেই। দক্ষ চালক হলেও এই গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপির জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কমিটি ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমরা চেয়েছিলাম, রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন হবে। সবাই ন্যায়সঙ্গতভাবে সমান আচরণ পাবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, শুধু চেয়ার পরিবর্তন হয়েছে। কেউ এমপি হয়েছেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

‘ব্যক্তিগতভাবে অনেকের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন হয়নি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকের আসনে তারেক রহমানকে বসানো হয়েছে। এই গাড়ির ইঞ্জিন, স্টিয়ারিং ও চাকা ঠিক না থাকলে যত দক্ষ চালকই হোন না কেন, গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না।’

বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের অভিযোগ তুলে হাসনাত বলেন, বিএনপির মুখে জুলাই, কিন্তু অন্তরে আওয়ামী লীগ—এমন একটি সম্পর্ক দেশের রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে আসা নতুন অংশের পার্থক্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Nagad
Nagad

হাসনাতের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতিত বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এখন দলের ভেতরে গুরুত্ব পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, নতুন করে বিএনপিতে যুক্ত হওয়া একটি অংশ ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বক্তব্যে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেননি তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলোচনা না করে অনেক মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে এসব মামলাকে অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সারা বাংলাদেশের থানাগুলোতে হওয়া মামলাগুলোর কয়টির চার্জশিট হয়েছে, সাংবাদিকদের কাছে সেই প্রশ্ন রাখতে চাই। আমরা বারবার বলেছি, দ্রুত চার্জশিট দেন। প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়ে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের ব্যবস্থা করেন।

তার অভিযোগ, মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব মামলার দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বললেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা অর্জন করা কঠিন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। তার অভিযোগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বণ্টনে সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। সার ও অন্যান্য পণ্যের ডিলারশিপ বণ্টন এবং সরকারি ঠিকাদারি কাজেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সম্পদ বৃদ্ধি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলে হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেন, সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নে হাসনাত বলেন, শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিচার নয়, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ এখনো দল হিসেবে অতীতের অপরাধ স্বীকার করেনি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ কি কোথাও স্বীকার করেছে যে তারা অপরাধ করেছে? অপরাধ স্বীকার না করে পুনর্মিলনের আলোচনা কীভাবে আসে? গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ টেনে হাসনাত বলেন, দেশটির বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ন্যাশনাল পার্টির রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি দেখতে হবে। এসময় তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করা, আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করা এবং পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেও অনেক নেতাকর্মী এখনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত। অন্যদিকে, তাদের দলের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। বিএনপি সরকারের যত বড় মন্ত্রীই হোন না কেন, তাদের জনগণের জন্য কাজ করতে হবে এবং দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করতে হবে।