Print

সারাদিন

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার বা ক্যাম্পাস: নীতিমালার অপেক্ষা আর কত দিন!

প্রকাশিত: ১০:৫১ পূর্বাহ্, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

মো: আব্দুল্লাহ-আল-ওয়াদুদ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকায়ন, বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং বিশ্বমানের মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদনপ্রক্রিয়া ও সময়বদ্ধ সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করা, শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি। ক্রস-কালচারাল লার্নিং, ব্লেন্ডেড লার্নিং ও ডিস্ট্যান্স লার্নিংয়ের মতো আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও এসব পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও বিশ্বের অন্যান্য উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, ব্যবহারিক দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সমন্বয় আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও সক্ষম করে তুলতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

উদ্যোগ আছে, বিনিয়োগ আছে—কিন্তু অনুমোদনের নিশ্চয়তা কোথায়?

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোক্তা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে স্টাডি সেন্টার, শিক্ষাকেন্দ্র কিংবা ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই অবকাঠামো নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, প্রযুক্তিগত সুবিধা, জনবল নিয়োগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছেন। এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা—বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেন নিজ দেশে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, বিদেশে পড়াশোনার বিপুল ব্যয় কিছুটা এড়াতে পারে এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রযোজ্য অনুমোদন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা নিয়ে স্পষ্টতা অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তারা যদি দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তাহলে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়বে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে এবং বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্বও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহী, তাদের জন্য অনুমোদনের সুস্পষ্ট পথটি কোথায়? আবেদন জমা দেওয়ার পর সিদ্ধান্তের জন্য কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? আর আবেদনকারীদের কীভাবে জানানো হবে যে তাঁদের প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছে কি না?

২০১৪ সালের নীতিমালা: বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ

Nagad
Nagad

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টারসংক্রান্ত বাংলাদেশে বিদ্যমান ২০১৪ সালের বিধিমালা এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার ধরন, প্রযুক্তি, শিক্ষাদানপদ্ধতি এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বের কাঠামো অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, একটি স্টাডি সেন্টার, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে পরিচালিত কোনো শিক্ষাকেন্দ্র এবং পেশাগত সার্টিফিকেশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এক নয়। তাদের শিক্ষাগত উদ্দেশ্য, ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা, একাডেমিক দায়িত্ব এবং মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাও ভিন্ন হতে পারে।

তাই বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বিদ্যমান বিধিমালা পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধিত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকা উচিত-কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান কী শর্তে অনুমোদন পাবে, কোন কর্তৃপক্ষ আবেদন মূল্যায়ন করবে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি কীভাবে যাচাই হবে এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
নীতিমালা আধুনিকায়নের অর্থ নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা নয়; বরং নিয়ন্ত্রণকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক করা।

আবেদন গ্রহণের পরও সিদ্ধান্তের অপেক্ষা কেন

২০২৬ সালের ৩০ মার্চ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনুমোদনহীন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে নির্দেশনা দেয় এবং ২৫ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদনের জন্য আবেদন করার কথা জানায়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আবেদন জমা দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সামনে আসে। কিন্তু আবেদন আহ্বানের পরবর্তী পর্যায়ে আবেদন যাচাই, পরিদর্শন, ঘাটতি সংশোধন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করেছে, তারা কোন পর্যায়ে রয়েছে, কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে এবং কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে-এসব তথ্য আবেদনকারীদের জানানো হলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে আসবে।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে শর্তহীন অনুমোদন দেওয়া নয়। মূল প্রশ্ন হলো, যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে কি না।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, বিদেশি অংশীদারের স্বীকৃতি, কারিকুলাম, শিক্ষক, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা শিক্ষার্থীসেবায় ঘাটতি থাকে, তাহলে তা লিখিতভাবে জানানো যেতে পারে। সংশোধনযোগ্য ঘাটতি থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পূরণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আর কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মান পূরণে ব্যর্থ হলে বিধি অনুযায়ী তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে একদিকে শিক্ষার মান বজায় থাকবে, অন্যদিকে যোগ্য উদ্যোক্তারাও তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, নাকি সহযোগিতা

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে গবেষণা, কর্মমুখী শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার বা ক্যাম্পাসকে কেবল প্রতিযোগী হিসেবে দেখার পরিবর্তে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান দেশে এলে শিক্ষার বাজারে গুণগত প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, নতুন শিক্ষাপদ্ধতির প্রচলন হতে পারে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের মান উন্নয়নে উৎসাহিত হতে পারে।

কিছু মহলে অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যমান শিক্ষাবাজারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কোনো পক্ষ নতুন বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারে। তবে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে অনুমোদনপ্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার জন্য দায়ী করা উচিত নয়। এ ধরনের অভিযোগের যথাযথ সমাধান হতে পারে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, প্রকাশ্য মানদণ্ড এবং সবার জন্য সমান নিয়ম নিশ্চিত করা।
কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি নাম ব্যবহার করছে বলেই সেটিকে মানসম্মত ধরে নেওয়া যাবে না। একইভাবে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলেই কোনো উদ্যোগকে আগাম প্রত্যাখ্যান করাও যুক্তিসংগত নয়। সিদ্ধান্ত হতে হবে প্রমাণ, যোগ্যতা, শিক্ষাগত মান এবং আইনগত শর্তের ভিত্তিতে।

আন্তর্জাতিক কারিকুলাম: বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সামনে এখন সাইবার সিকিউরিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডেটা সায়েন্স, ফিন্যান্স, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানসম্মত সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। ক্রস-কালচারাল লার্নিংয়ের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন দেশের চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারে। ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষার সমন্বয় সম্ভব হয়। আর যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের অধীনে ডিস্ট্যান্স লার্নিং উচ্চশিক্ষার সুযোগকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষকতার মান, পরীক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন ভর্তি হওয়ার আগে কোর্সের প্রকৃতি, ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, স্বীকৃতির অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানে যোগ্যতার ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

আইনের শাসন ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

এই বিষয়টির সঙ্গে আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী আচরণ ও আইনের সুরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে এই সাংবিধানিক বিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না যে, নতুন নীতিমালা ছাড়াই প্রতিটি আবেদন অনুমোদন করতে হবে। অনুমোদনের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রযোজ্য আইন, বিধিমালা, কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার ওপর।

সরকারের দায়িত্ব হলো বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার অধীনে কোন আবেদন কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, তা স্পষ্ট করা। নতুন নীতিমালা প্রয়োজন হলে তার প্রণয়নের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে, বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় কোনো আবেদন বিবেচনার সুযোগ থাকলে কেবল ভবিষ্যতে নতুন নীতিমালা আসতে পারে—এই যুক্তিতে অনির্দিষ্টকাল সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়।
একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও প্রযোজ্য আইন ও অনুমোদনের শর্ত মেনে চলতে হবে। বিনিয়োগ বা অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনুমোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। তবে যোগ্য আবেদনকারীদের ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং কারণসমর্থিত সিদ্ধান্ত পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।

সরকারের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা যায়।
প্রথমত, দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত:২০১৪ সালের বিধিমালা পর্যালোচনা করে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংশোধন, ব্যাখ্যা বা প্রয়োজনীয় নতুন নীতিমালা প্রণয়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা।

দ্বিতীয়ত, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সূচি:২৫ এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানানো এবং যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য একটি সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ করা।
তৃতীয়ত, অনুমোদনের মানদণ্ড প্রকাশ:প্রয়োজনীয় নথি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি যাচাই, অবকাঠামোগত শর্ত, শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক সক্ষমতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড স্পষ্ট করা।
চতুর্থত, পৃথক শ্রেণিভিত্তিক নীতিমালা:পূর্ণাঙ্গ শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার, অংশীদারত্বভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং পেশাগত সার্টিফিকেশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা।
পঞ্চমত, স্বচ্ছ ফি ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া:আবেদন ফি, পরিদর্শন ফি, অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যয় এবং অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ প্রকাশ করা, যাতে কোনো অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বা অস্বচ্ছতার সুযোগ না থাকে।
ষষ্ঠত, শিক্ষার্থী ও বিনিয়োগের সুরক্ষা:অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান যেন শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিকরভাবে স্বীকৃতি বা ডিগ্রির নিশ্চয়তা না দেয়, তা নিশ্চিত করা।

সপ্তমত, আপিল ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ:কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তার কারণ লিখিতভাবে জানানো এবং প্রযোজ্য নিয়মে পুনর্বিবেচনা বা আপিলের সুযোগ রাখা।

নীতিমালার অপেক্ষা নয়, এখন চাই কার্যকর সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের আইন, শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। এ দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি সুস্পষ্ট ও আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে উভয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার ও ক্যাম্পাসসংক্রান্ত অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান পূরণ করবে, তাদের আইনসম্মতভাবে অনুমোদনের সুযোগ দিতে হবে। আর যারা মান পূরণ করতে পারবে না, তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেন নিজ দেশে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, যোগ্য উদ্যোক্তারা যেন সুস্পষ্ট নিয়মের মধ্যে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং দেশীয় ও বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন গুণগত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নত করতে পারে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার বা ক্যাম্পাসের অনুমোদনপ্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এখন প্রয়োজন দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ মূল্যায়ন, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য সুযোগ।

নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে এই সময়োপযোগী উদ্যোগ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই—বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার বা ক্যাম্পাসের জন্য নীতিমালার অপেক্ষা আর কত দিন?

মো: আব্দুল্লাহ-আল-ওয়াদুদ
সিইও, এসেক্স স্কুল অফ বিজনেস