প্রকাশিত: ১১:৩০ পূর্বাহ্, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্তে মাদক, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ কারবার নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। নিজের ফেসবুক পেজ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’-এ এসব কারবারের ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ করতেন তিনি। হত্যার আগের দিনও চাঞ্চল্যকর অপরাধের ‘গডফাদারের’ তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর পরদিনই গুলিতে নিহত হন তিনি।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে আলিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ কারবার নিয়ে লেখালেখি এবং আগে থেকেই নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। খবর জাগো নিউজের।
পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সীমান্তের অবৈধ কারবার নিয়ে লেখালেখির কারণে কয়েকজনের সঙ্গে আলিফের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন। তবে এসব বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ বলছে, তদন্তে কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী এবং তাঁদের সঙ্গে আলিফের বিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
যাদের ঘিরে সন্দেহ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুরের বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে শামীম আহমেদ ওরফে শুটার শামীম এবং তাজুল ইসলামের নাম রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আলিফের ফেসবুক পেজে তাঁদের নিয়ে লেখালেখির কারণে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তবে আলিফ হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুলিশ এখনো নিশ্চিত করেনি।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ২৯টি মামলা হয়েছে। তাজুলের বিরুদ্ধে রয়েছে ১৬টি মামলা। এর মধ্যে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলায় তাজুলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নেতা সুব্রত সাংমা হত্যা মামলায় শামীমের নাম আসে। সীমান্তের ব্যবসা ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলে সে সময় অভিযোগ ওঠে।
এর দুই বছর পর, ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নলজোরা গ্রামের মবিবুর রহমান ওরফে দা মজিবুর নিহত হন। ওই মামলাতেও শামীমকে প্রধান আসামি করা হয়। তবে এসব মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই।
শামীম কুল্লাগড়া ইউনিয়নের কাকড়াকান্দা গ্রামের আবদুস সাত্তারের ছেলে। তাঁর সৎভাই কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল। শামীম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শামীম আহমেদ আমার সৎভাই। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শামীম আহমেদকে নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।”
শামীম ও তাজুলের বক্তব্য জানতে তাঁদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আলিফ হত্যার পর তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
সীমান্তের অবৈধ কারবার নিয়ে অনুসন্ধান
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা দুর্গাপুরে দীর্ঘদিন ধরে পাথর, বালু, মাদকসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া, পরিবহন এবং স্থানীয় পর্যায়ে এসব কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব কারবারের আধিপত্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও উঠেছে।
আলিফ এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত অনুসন্ধান করতেন। তাঁর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজে সীমান্তের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হতো। তাঁর এক সহকর্মীর দাবি, এসব প্রকাশের কারণে অবৈধ কারবারে জড়িত কিছু মানুষের কাছে তিনি অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সহকর্মী বলেন, ‘সীমান্তের বিভিন্ন অবৈধ কারবারে কারা জড়িত, তা নিয়ে লুৎফুজ্জামান ফেসবুকে লেখালেখি ও ছবি-ভিডিও প্রকাশ করতেন। এ কারণে কারও কারও সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল। হত্যার সঙ্গে এসবের যোগসূত্র আছে কি না, তদন্তেই তা বেরিয়ে আসবে।’
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আলিফের উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে আগের একটি হামলার ঘটনায়। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে আহত করা হয়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাঁরা জামিনে রয়েছেন।
হামলার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন আলিফ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় তিনি সীমান্তের অপরাধ, অস্ত্রধারীদের তৎপরতা এবং নিজের ওপর হামলার আশঙ্কার কথা জানান।
অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১১ মাস আগে সম্ভাব্য বিপদের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছিলেন তিনি। আগের হামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
হত্যার আগের পোস্টে কী ছিল?
আলিফ হত্যার আগের দিন তাঁর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ।’ হত্যার প্রায় দুই ঘণ্টা আগেও পেজটিতে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ৪১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর সঙ্গে লেখা ছিল, ‘নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের গডফাদার বাবুল।’
এই পোস্টগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। আলিফ নতুন কোনো তথ্য প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কি না, কিংবা তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মোবাইল ফোনে থাকতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার দাবি, তাঁর স্বামীর মুঠোফোনে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘স্বামীর মোবাইলফোনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে। ফোনের তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড ও অনুসন্ধানের নথি হত্যার উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।’
আলিফের ফোনের কলতালিকা, বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনবক্স, ভিডিও ও ছবির উৎস এবং সাম্প্রতিক যোগাযোগের তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। হত্যার আগে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কাদের নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন, সেসব তথ্য থেকে হত্যার নেপথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলিফের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির বলেন, তাঁর ভাই সীমান্তের বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। এ কারণেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে তিনি মনে করেন।
ছয় গুলির আঘাত, গ্রেপ্তার একজন
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে আলিফকে গুলি করা হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, তিনি তাজুল ইসলামের সহযোগী। আদালত অপূর্বর চার দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে কি না, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্তে অগ্রগতির কথা পুলিশের
আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘এই হত্যা মামলাটি নিয়ে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি। আমরা ইতোমধ্যে অনেক এগিয়ে গেছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যেই আপনাদের সামনে সবকিছু প্রকাশ করব। আপনারা জানেন, দুর্গাপুরে চিহ্নিত কয়েকজন অপরাধী রয়েছেন। তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আত্মগোপনে চলে যান।’ নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ১৯ অক্টোবর গভীর রাতে পুলিশ, এসআরবি ও বিজিবি যৌথভাবে সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় একজন অপরাধীর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। তিনি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখনই কিছু বলছি না। একটু অপেক্ষা করুন, সবকিছুই জানাতে পারব।’
যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত
আলিফ হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সীমান্তের অবৈধ কারবার নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান কি হত্যার কারণ? যাঁদের নিয়ে তিনি লেখালেখি করতেন, তাঁদের কেউ কি হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত? আগের হামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি? হত্যার আগের দিন ‘গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ’ প্রকাশের ঘোষণার পেছনে কী তথ্য ছিল? তাঁর মুঠোফোন ও ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজের তথ্য কি হত্যার নেপথ্যে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সহায়তা করবে?
এসব প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আলিফের দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ কারবার নিয়ে লেখালেখি, আগের হামলা, নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ এবং হত্যার আগে দেওয়া পোস্টগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সূত্র; জাগো নিউজ