প্রকাশিত: ১০:০৬ পূর্বাহ্, নভম্বর ৮, ২০২৬
সারাদিন ডেস্ক
হাতে ১০ লাখ টাকা জমেছে। এই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করলে ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে-এ প্রশ্ন অনেকেরই। ব্যাংকের স্থায়ী আমানত বা এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয়, সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, শেয়ারবাজার কিংবা জমি-বিনিয়োগের একাধিক সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু বেশি মুনাফার আশায় একটি খাতে পুরো অর্থ বিনিয়োগ করা ঠিক নয়। নিরাপত্তা, মুনাফা, বিনিয়োগের মেয়াদ এবং প্রয়োজনে দ্রুত টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সঞ্চয়পত্র: তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিকল্প
যারা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পেতে চান, তাদের কাছে সঞ্চয়পত্র জনপ্রিয়। ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রয়েছে। ধরন ও বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র—বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। তবে সব সঞ্চয়পত্র সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। পরিবার ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা রয়েছে।
১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের আগে কোন সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে, সর্বোচ্চ সীমা কত এবং মুনাফার ওপর কী হারে কর প্রযোজ্য—এসব যাচাই করতে হবে। মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে মুনাফার পরিমাণও কমে যেতে পারে।
এফডিআর: সহজ ও প্রচলিত বিনিয়োগ
১০ লাখ টাকা ব্যাংকের স্থায়ী আমানত বা এফডিআরে রাখাও প্রচলিত একটি পদ্ধতি। এক মাস, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর বা তার বেশি মেয়াদে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করা যায়।
ব্যাংকভেদে সুদের হার ভিন্ন। বিভিন্ন ব্যাংকের তালিকায় এক বছর বা তার বেশি মেয়াদের এফডিআরে ৮ দশমিক ২৫ থেকে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেখা যাচ্ছে। তবে আমানতের পরিমাণ, মেয়াদ ও ব্যাংকের নীতির ওপর ভিত্তি করে হার পরিবর্তিত হতে পারে।
এফডিআরের সুবিধা হলো, বিনিয়োগের মেয়াদ ও সুদের হার আগে থেকেই জানা যায়। অনেক ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
তবে শুধু বেশি সুদের হার দেখে ব্যাংক নির্বাচন করা উচিত নয়। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, তারল্য, সুশাসন ও আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনা করতে হবে।
ডাকঘর সঞ্চয়: তিন বছরে ১১ শতাংশের বেশি
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মেয়াদি হিসাবেও টাকা রাখা যায়। তিন বছর মেয়াদি হিসাবে বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী মুনাফার হার নির্ধারিত হয়।
৭ লাখ ৫০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর শেষে মুনাফার হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬০, ১১ দশমিক ১৬ ও ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার প্রযোজ্য হবে। তবে হিসাব খোলার আগে মুনাফা পাওয়ার নিয়ম, উৎসে কর এবং মেয়াদপূর্তির আগে টাকা তোলার শর্ত জেনে নেওয়া জরুরি।
ট্রেজারি বিল-বন্ড: সরকারি ঋণপত্র
সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডও ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের একটি বিকল্প। ট্রেজারি বিল সাধারণত স্বল্পমেয়াদি এবং ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে মেয়াদ, ইস্যুর শর্ত ও বাজার পরিস্থিতির ওপর প্রকৃত আয় নির্ভর করবে।
মেয়াদপূর্তির আগে বিক্রি করতে হলে বাজারদরের পরিবর্তনের কারণে প্রত্যাশিত মুনাফার চেয়ে কম অর্থ পাওয়া বা লোকসানের আশঙ্কা থাকতে পারে।
শেয়ারবাজার: মুনাফার সুযোগ, ঝুঁকিও বেশি
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং বাজারের ওঠানামা সহ্য করার সক্ষমতা থাকলে শেয়ারবাজার বিবেচনা করা যেতে পারে। ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে মূলধনি মুনাফা পাওয়া যায়। পাশাপাশি লভ্যাংশ থেকেও আয় হতে পারে।
তবে এখানে নির্দিষ্ট মুনাফার নিশ্চয়তা নেই। শেয়ারের দাম কমে গেলে বিনিয়োগের মূল্যও কমে যেতে পারে। তাই পুরো ১০ লাখ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করে ঝুঁকি অনুযায়ী সীমিত অংশ বিনিয়োগ করা তুলনামূলক নিরাপদ।
বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ, নগদ প্রবাহ, লভ্যাংশের ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনার মান যাচাই করা উচিত।
জমি: দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ, নগদায়ন কঠিন
১০ লাখ টাকা দিয়ে জমি কেনার কথাও অনেকে ভাবতে পারেন। তবে ঢাকা বা বড় শহরের ভালো এলাকায় এ অর্থে জমি পাওয়া কঠিন। শহরের বাইরে বা উন্নয়নশীল এলাকায় ছোট আকারের জমি কেনার সুযোগ থাকতে পারে।
জমির অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, আশপাশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর এর মূল্য নির্ভর করে। তবে জমির বড় সীমাবদ্ধতা হলো—প্রয়োজনে দ্রুত বিক্রি করে নগদ টাকা পাওয়া কঠিন হতে পারে। নিবন্ধন, কর ও অন্যান্য খরচও রয়েছে।
জমি কেনার আগে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, দখল এবং মামলা বা বিরোধ রয়েছে কি না—সবকিছু যাচাই করা জরুরি।
১০ লাখ টাকা কীভাবে ভাগ করবেন?
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব টাকা এক জায়গায় না রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে ভাগ করে রাখাই তুলনামূলক ভালো কৌশল। এতে একটি খাতে সমস্যা হলেও পুরো সঞ্চয় ঝুঁকিতে পড়বে না।
উদাহরণ হিসেবে, জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য কিছু অর্থ সহজে তোলা যায় এমন হিসাবে রাখা যেতে পারে। বাকি অর্থ ঝুঁকি ও মেয়াদ অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র, এফডিআর বা সরকারি ঋণপত্রে রাখা যেতে পারে। ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা থাকলে সীমিত অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের কথাও ভাবা যায়।
বিনিয়োগের আগে পাঁচটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—জরুরি অর্থ আলাদা রাখা, বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্বাভাবিক বেশি মুনাফার প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলা, কর ও অন্যান্য খরচ হিসাব করা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও টাকা ফেরত পাওয়ার শর্ত যাচাই করা।
সব মিলিয়ে, ১০ লাখ টাকা কোথায় বিনিয়োগ করবেন—এর একক কোনো উত্তর নেই। যারা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে নির্দিষ্ট মুনাফা চান, তারা সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয়, ভালো ব্যাংকের এফডিআর বা সরকারি ঋণপত্র বিবেচনা করতে পারেন। আর বেশি মুনাফার সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকলে শেয়ারবাজার বা জমি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কত টাকা মুনাফা হবে তা নয়, মূল টাকা কতটা নিরাপদ থাকবে এবং প্রয়োজনের সময় কত সহজে তা ফেরত পাওয়া যাবে-এ দুটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: বাংলাট্রিবিউন