কিশোর গ্যাং-চাঁদাবাজ-মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের ভাবনা

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৪ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দমনে ‘ভিন্ন’ ধরনের বড় একটি অভিযান চালানোর বিষয়টি আলোচনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’কে এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে সামনে রাখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযানের কোনো নাম দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে দেশব্যাপী অভিযানের পথনির্দেশিকা চূড়ান্ত করা হতে পারে। চলতি সপ্তাহে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নিয়ে বৈঠক হতে পারে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে। খবর সমকালের।

সূত্রের দাবি, অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করার পাশাপাশি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে জোরালো ব্যবস্থা নিতে চান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা। ‘ভিন্ন’ ধরনের অভিযান চূড়ান্ত হলে অপরাধীদের কাছে বড় ধরনের বার্তা দেওয়াও এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগ

সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় পৃথক চারটি স্থানে হামলা, দখলচেষ্টা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

Nagad

মিরপুর-১ নম্বরে গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই থেকে আড়াইশ মানুষের একটি দল হামলা চালিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাতেও হামলা হয়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর ও আদাবরে বাড়ি ও জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, ধারাবাহিক এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটেই নতুন ধরনের অভিযানের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাদক

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারে দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও এ বিষয়ে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে নতুন ধরনের যে অভিযান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। শেষ পর্যন্ত অভিযান হবে কি না, হলে এর সময়সূচি ও রূপরেখা কী হবে—সেটিও তারাই নির্ধারণ করবেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেক কর্মকর্তা জানান, বড় অভিযানের নাম দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও ভিন্ন মত রয়েছে। একটি মত হলো, কোনো নাম দিয়ে বড় অভিযান চালানোর পর সেটি ব্যর্থ হলে বা সমালোচনার মুখে পড়লে পরবর্তী সময়ে ওই নাম নেতিবাচক প্রচারণার অংশ হয়ে যেতে পারে।

অতীতের বিভিন্ন অভিযান

বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২০০২ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৪ দিন চলা এ অভিযানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় ১২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার এবং দুই হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। পরে অভিযানসংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দিতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

২০১৮ সালে মাদক দমনে ‘বিশেষ অভিযান’ এবং ২০১৯ সালে ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনা করা হয়। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কয়েক দফা অভিযান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।

পুলিশের তালিকায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ী

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। নতুন তথ্যের ভিত্তিতে এসব তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। সম্প্রতি সারাদেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকাও তৈরি করেছে পুলিশ সদরদপ্তর।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, খুলনা মহানগরে ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে—২৫টি।

রাজধানীতে রয়েছে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৮১২। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে ২৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে এবং সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩৫০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি গ্যাং রয়েছে পল্লবী থানা এলাকায়, যেখানে সদস্য সংখ্যা ১৬০।

এদিকে রাজধানীকেন্দ্রিক মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৪০৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে একযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিট এ কার্যক্রম শুরু করেছে।

এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি-সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৫৩০ জনের নাম রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও মব সন্ত্রাসের কারণে দেশকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিশোর গ্যাংয়ের নতুন নতুন তৎপরতাও পরিস্থিতিকে সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জানমাল রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে যৌথ অভিযান প্রয়োজন হলেও এ ধরনের অভিযানে মানবাধিকার রক্ষায় সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।

পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসাইন বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজসহ বিভিন্ন অপরাধীর বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। তার ভাষ্য, চলচ্চিত্র ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গ্যাং সহিংসতাকে আকর্ষণীয়, বীরত্বপূর্ণ ও ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের কারণে অনেক কিশোর অপরাধে জড়াতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে সমাজের সবার ভূমিকা প্রয়োজন।