নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:০৯ পূর্বাহ্, অক্টোবর ১০, ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দক্ষিণ আফ্রিকান আইনবিদ ও আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার (৯ অক্টোবর) এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইসিসি নিষেধাজ্ঞাকে আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে।

এক বিবৃতিতে আদালতটি বলেছে, তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রকে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আদালত একা টিকে থাকতে পারে না। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলোর ওপর। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার বিষয় নয়, বরং আইনের শাসনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষার বিষয়।

যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করতে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিসি। আদালতটির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধী মনোভাব পোষণ করে আসছে। এর আগে সংস্থাটির কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এবারের পদক্ষেপের আওতায় আদালতকে সেবা দেওয়া কোম্পানিগুলোও শাস্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো আমেরিকানের বিচার করার জন্য আইসিসিকে অনুমতি দেবেন না। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। তাঁর ভাষ্য, আইসিসির সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা, এর সম্পদ ও অর্থপ্রাপ্তির পথ বন্ধ করা এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের একটি ছাড়ের সময়সীমা এবং আরও কিছু বিশেষ ছাড়ের কথা উল্লেখ করেছে। এর ফলে টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন প্রদান এবং বন্দিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেন চালু রাখা সম্ভব হবে।

Nagad

রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধানের সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞাটি এমনভাবে কার্যকর করা হয়েছে। দাবি পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞার শর্ত পরিবর্তন করা হতে পারে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অতীতের তদন্তের কারণে আইসিসির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধ তীব্র হয়েছে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান রয়টার্সকে বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দুর্বল করা। তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

আইসিসি বিশ্বনেতা ও বৈশ্বিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ ৭০ জনেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ এনেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। নেতানিয়াহুর পাশাপাশি হামাসের নেতাদের বিরুদ্ধেও আদালতটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পদক্ষেপ নিয়েছে। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াট্টার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করা হয়।

আইসিসি অতীতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। সদস্যদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর সব সদস্য রয়েছে। আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে।

নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সময় নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তখন এ পুরস্কার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোর প্রতি সমর্থনের নিদর্শন। পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

নোবেল কমিটির ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের অন্যতম পূর্বশর্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটিতে অবস্থিত কোম্পানিগুলোর পক্ষে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে পারে, বিমা কোম্পানি সুবিধা বাতিল করতে পারে এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা বন্ধ করতে পারে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

রুবিও বলেন, আইসিসি ও এর প্রতিষ্ঠাতা চুক্তি ‘রোম স্ট্যাটিউট’-এর সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করবে—এমন আশা থেকেই নিষেধাজ্ঞা আরোপে বিলম্ব করা হয়েছিল। তবে তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে আইসিসির সদস্য এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল মিত্র দেশগুলোকে আদালতটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি।