র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:৫১ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদনসহ চার কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে ফেরত পাঠাতে বলা হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউনিটটির ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের আওতায় থাকবে এসআরবি

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, সশস্ত্র সদস্য ও কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করবে। এর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়।

এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

Nagad

যেসব দায়িত্ব থাকবে

বিল অনুযায়ী, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এসআরবির অন্যতম দায়িত্ব।

এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করবে ইউনিটটি। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধের তদন্তও করতে পারবে।

তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা

বিলে এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান আইনের বিধান মেনে প্রয়োগ করতে হবে।

গ্রেপ্তার বা আলামত জব্দের পর তা এসআরবির কাছে আটকে রাখা যাবে না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে বা জব্দ করা আলামত দ্রুত নিকটস্থ থানার হেফাজতে হস্তান্তর করতে হবে এবং এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে।

ফৌজদারি মামলার তদন্ত

আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যে কোনো সময় এসআরবির মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।

তদন্তের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে।

শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে শাস্তি

বিলে এসআরবি সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত বা অসদাচরণ, অনুমতি ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মতো বিষয় রয়েছে।

এ ছাড়া অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম হারানো, বলপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকাকেও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, জরিমানা, তিরস্কার ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।

বিভাগীয় কার্যধারায় দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে।

অভিযোগ প্রতিকারে মানবাধিকারকর্মী

এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিতে এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের অন্যূন এআইজি পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, আইন বা বিচার প্রশাসনে অভিজ্ঞ একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যোগদানের পর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ

এসআরবির সব সদস্যের জন্য ইউনিটে যোগদানের পর নির্ধারিত মেয়াদে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। সদর দপ্তরে একটি গবেষণা সেল থাকবে, যা অপারেশনাল ও তদন্তসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করবে।

র‌্যাবের জনবল-সম্পদ যাবে এসআরবিতে

আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। একই সঙ্গে র‌্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাববহি, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিল এসআরবির অনুকূলে স্থানান্তর ও ন্যস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতির পরিবর্তন এবং জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতার প্রয়োজন বাড়ছে।

সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ ও অন্তর্দেশীয় অপরাধ, চরমপন্থা, মানবপাচার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে একটি আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে র‌্যাবের পরিবর্তে এসআরবি প্রতিষ্ঠার জন্য বিলটি আনা হয়েছে।

বিলে আরও বলা হয়েছে, নতুন ইউনিটের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।