বছরজুড়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদার হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, শুধু রমজান মাস নয়, সারা বছর নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা–সংক্রান্ত সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কেউ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

সভায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রমজান মাসে ভোগ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তবে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা শুধু রমজানকেন্দ্রিক নয়। সারা বছরই পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য সহনীয় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। পণ্য পরিবহণেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবও কয়েকটি এলাকায় বাজারে পড়েছে। তবে শীতকাল সামনে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করবে ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতির খোঁজ রাখার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের দামে দুই-চার টাকার অস্বাভাবিক ওঠানামা সামগ্রিক হিসাবে খুব বড় মনে না হলেও তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাজারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মানুষের আস্থা ধরে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Nagad

মন্ত্রী জানান, বাজারে মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হবে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশকেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একবারে না দিয়ে একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপরই পড়ে। তাই জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিকও পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত পণ্য ও যেসব পণ্যের ঋণপত্র বা এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে কিংবা যেগুলো জাহাজীকরণ পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

আমদানি পরিস্থিতি ইতিবাচক

সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির একটি চিত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে জানানো হয়, গত বছরের তুলনায় দেশে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক।

কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে মসুর ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে এক লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।

ভোজ্যতেলের কাঁচামাল বা সিড আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে দুই লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন সিড আমদানি হয়েছিল। চলতি বছর তা বেড়ে তিন লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা তৈরি হয়। কমিশন জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি ইতিবাচক রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ট্রেসেবিলিটি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ডিম ও পোল্ট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে এ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য বাজারে পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখা ও ভোক্তাদের আস্থা শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শ বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।

সভায় ব্যবসায়ী নেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহণ, সরবরাহ ও বাজারমূল্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।