নিত্যপণ্যের দাম একের পর এক বাড়ছে, বাজারে বাড়ছে চাপ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগেই প্রায় দেড় মাস ধরে আটা-ময়দার বাড়তি দামে ভুগছিলেন ক্রেতারা। গত সপ্তাহে পণ্য দুটির দাম কেজিতে আরও ১০ টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বেড়েছে পরিবহন ভাড়াও। এতে নতুন করে চাল, ডিমসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় প্রতি কেজিতে পয়সার হিসাবে বাড়লেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে টাকার অঙ্কে। ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আটা-ময়দা কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা
রাজধানীর নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা ৭০ টাকা এবং ময়দা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্য দুটির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।
খোলা আটা ও ময়দার দাম তুলনামূলক কম। খোলা আটা কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দামও কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা করে বেড়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক বলেন, এক থেকে দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বেড়েছিল। এখন আবার দাম বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর নতুন সরবরাহ করা দুই কেজির প্যাকেটজাত আটার গায়ে ১৪০ টাকা এবং ময়দার গায়ে ১৬০ টাকা খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে। সামান্য লাভ হওয়ায় তারা গায়ের দামেই পণ্য বিক্রি করছেন।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ এবং ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাড়তে পারে চালের দাম
আটা-ময়দার উচ্চমূল্যের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে চালের বাজারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মাসখানেক ধরে স্থির থাকা চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের বিক্রয়কর্মী মহিউদ্দিন বলেন, তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৫ টন চাল এনেছেন। দুই দিন আগে যেখানে ট্রাক ভাড়া ছিল ১৭ হাজার টাকা, এখন দিতে হয়েছে ২১ হাজার টাকা।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি চালের জন্য পরিবহন ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় ২৭ পয়সা বেড়েছে। তার ভাষ্য, গাড়িভাড়া বাড়ায় চালের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই।
পাশের দোকান মুক্তা রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান বলেন, পরিবহন ব্যয়ের কারণে চালের দাম প্রায় ৫০ পয়সা বাড়ার কথা। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তা এক টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে নতুন দাম তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না। আগের কেনা চাল শেষ হওয়ার পর নতুন চাল বিক্রি শুরু হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের ইয়াসিন ট্রেডার্সের এক বিক্রয়কর্মী জানান, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে চাল আনতে আগে ছোট পিকআপে প্রায় দেড় হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এখন আরও ২০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বাড়তি পরিবহন ব্যয় চালের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। তার মতে, ডিজেলের দাম বাড়ায় চালকলের খরচও বাড়তে পারে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে এর প্রভাব খুচরা বাজারে পড়তে পারে।
বাড়ছে পরিবহন ব্যয়
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংস্থাটির সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে প্রতি কেজি পণ্যের পরিবহন খরচ হয়তো ১৫ থেকে ২৫ পয়সা বাড়তে পারে। কিন্তু এর অজুহাতে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুযোগ নিতে পারেন। সরকারের নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা মনগড়া দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে না পারেন, সে জন্য বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রভাব পড়তে পারে চিড়া-মুড়িতেও
কারওয়ান বাজারে পাইকারি দরে চিড়া, মুড়ি, খই ও গুড় বিক্রি করেন মনির হোসেন। তিনি জানান, বরিশাল থেকে তিন হাজার ২০০ কেজি হাতে ভাজা মুড়ি আনতে আগে ১৬ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। গতকাল একই পরিমাণ মুড়ি আনতে তিন হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে।
বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি মুড়ি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে তার প্রতি কেজিতে প্রায় এক টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি টাকা পাইকারি দামের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। খুচরা বাজারে তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু চাল ও মুড়ি নয়, ডিজেলের দাম বাড়ায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে, যার চূড়ান্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।
ভোজ্যতেলের সরবরাহেও চাপ
চলতি মাসের শুরুতে বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বেড়েছিল। এরপরও বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদার পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
মহাখালীর কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক জানান, ভোজ্যতেল কোম্পানির ডিলাররা আরও দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ কারণে তারা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ডিমের হালি ৫৫ টাকা
গত দুই মাস ধরে ডিমের বাজারও চড়া। এর মধ্যে নতুন করে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম নাখালপাড়ার মা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন তার দোকানে ডিম সরবরাহকারী ব্যক্তি জানিয়েছেন, ট্রাক ভাড়া বাড়ায় পাইকাররা ডিমের দাম কিছুটা বাড়ানোর কথা বলেছেন।
গতকাল তিনি প্রতি ডজন বাদামি রঙের ফার্মের ডিম ১৬০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তবে চারটি ডিম কিনলে দাম রাখা হয়েছে ৫৫ টাকা।
তরল দুধ ও ফলের দামও বেড়েছে
সম্প্রতি সব কোম্পানির প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। দাম বেড়েছে আমদানি করা বিভিন্ন ফলেরও।
বাজারে প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং লাল আঙুর ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এসব পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বাজার তদারকি
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম বাড়বে—বিষয়টি এমন নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কিলোমিটারপ্রতি পরিবহন ভাড়া কত হওয়া উচিত এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়তে পারে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্রুত সে বিষয়ে বিশ্লেষণ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে গ্রাম থেকে ঢাকায় সবজি আনতে কত পয়সা অতিরিক্ত খরচ হবে, তা নির্ধারণ করা দরকার। এরপর কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাজার তদারকি করতে পারে। এতে ব্যবসায়ীরাও ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাজারে পণ্যের দামে সামান্য যে প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বলে তারা জানতে পারছেন। তবে ব্যবসায়ীদের এ সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, পরিবহন ভাড়া কেজিতে ২৫ পয়সা বাড়লে সেই অজুহাতে পণ্যের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রতিদিন বাজার তদারকি করা হচ্ছে এবং পরিবহন ভাড়া ও পণ্যের দাম কতটা বাড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নজরদারি আরও কঠোর করা হবে।

