সার ডিলার নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ, এমপিদের তদবির
দেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকায় তুলতে রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের তদবিরের পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এরই মধ্যে সার ডিলার নিয়োগে তদবির করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আসছেন সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও আবেদনকারীদের প্রতিনিধিরা। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, এখনো চূড়ান্ত নিয়োগ হয়নি। নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই।
সারাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর বিপরীতে আবেদন পড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৯৫টি। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে প্রায় নয়টি আবেদন জমা পড়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রাথমিক যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে। জেলা কমিটির যাচাই শেষে ওই তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদন ও তথ্য যাচাই করে প্রতি ইউনিয়নে একজনকে ডিলার হিসেবে মনোনয়ন দেবে। খবর সমকালের
সচিবালয়ে তদবির
গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিলার নিয়োগের আবেদন জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের আনাগোনা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীরা কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দপ্তরে যোগাযোগ করছেন।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের বড় একটি অংশ নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলেছেন।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করেছিলেন। পরে ওই তালিকার প্রথম ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবারও তদবির করা হয়।
এদিকে, বিভিন্ন জেলা থেকে রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
বিভিন্ন জেলায় অনিয়মের অভিযোগ
সচিবালয়ে তদবিরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘চুক্তি’ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবার কোথাও তালিকায় নাম তোলার জন্য টাকা চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বগুড়ায় ১৫৮টি ডিলার পদের বিপরীতে এক হাজার ২৬৬টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর আট শতাধিক আবেদনকারী বাদ পড়েছেন। বাদ পড়া কয়েকজনের অভিযোগ, তাদের কেন বাদ দেওয়া হয়েছে তা জানানো হয়নি। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জেলা কমিটির সদস্যসচিব সোহেল শামসুদ্দিন ফিরোজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন নেতার পক্ষ থেকে তদবির আসায় পুরো প্রক্রিয়া গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
রংপুরের পীরগাছায় নয়টি ইউনিয়নের সম্ভাব্য ডিলারদের একটি তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে স্থানীয় বিএনপির দুই নেতার স্ত্রীদের নাম থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও ওঠে। তবে সংশ্লিষ্ট এক নেতা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রাজশাহীতে ৭৩টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌর এলাকায় নতুন ডিলারশিপের জন্য দুই হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ পর্যায়ে ডিলারশিপ পেতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে তদবিরের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
রংপুরের কয়েকজন আবেদনকারীর অভিযোগ, সরকারি জামানতের ১০ হাজার টাকার বাইরে প্রাথমিক তালিকায় নাম তুলতে আরও দুই লাখ টাকা এবং চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে পাবনার সাঁথিয়ায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচের কথা বলে একটি চক্র আবেদনকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নীলফামারীর ডিমলার গয়াবাড়ী ইউনিয়নে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির এক সদস্যের ছেলে ও ভাগনের নাম তালিকায় থাকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মেহেরপুরেও ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেছেন, সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করেই ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকে ডিলার হিসেবে নির্বাচন করা হবে। রাজনৈতিক সুপারিশ বা তদবিরকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো আবেদনকারীর কাছ থেকে ডিলার নিয়োগের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে আসেনি। কেউ নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ করলে তা যাচাই করা হবে।
তিনি আরও জানান, বিপুলসংখ্যক আবেদন থাকায় যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তালিকা বা স্থানীয়ভাবে আলোচিত কোনো নামকে চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত এসব তালিকার বৈধতা নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন জেলায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়া এবং কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে।

