যোগদানের পাঁচ দিনের মাথায় প্রেস সচিবকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় পদ ছাড়তে হয়েছে কেটি জাকারিয়াকে। হোয়াইট হাউসে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তুতির ঘাটতি, আইনজীবী পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেটি জাকারিয়ার নিয়োগ এবং দ্রুত বিদায়ের ঘটনায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের প্রভাব ও নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের অভাব সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে এ ঘটনা হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান পদে দায়িত্ব পালনের জন্য জাকারিয়া যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন না। তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন দেখার পর এক উপদেষ্টা প্রশ্ন করেন, ‘কেউ কি তাকে নিয়োগের আগে যাচাই করেছিলেন?’ সিএনএনের প্রতিবেদনে একাধিক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ও উপদেষ্টার বরাতে বলা হয়েছে, নিয়োগের আগে তার যোগ্যতা ও প্রস্তুতি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
তবে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চেউং এসব আলোচনা ও জল্পনাকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, জাকারিয়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নতুন ভূমিকাতেও প্রেসিডেন্টকে সহযোগিতা করবেন। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাকারিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করাকে সম্মানের বলে উল্লেখ করেছেন।
যেভাবে প্রেস সচিবের দায়িত্ব পান জাকারিয়া
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট গ্রীষ্মের শেষে দায়িত্ব ছাড়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন তেমন তাড়াহুড়া করেননি। সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর নাম আলোচনায় এলেও তাদের কেউ কেউ অতীতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন। ফলে তাদের নিয়োগের সম্ভাবনা কমে যায়।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ট্রাম্পও মনে করতে থাকেন, তার পক্ষে কথা বলার মতো যথেষ্ট কণ্ঠস্বর নেই। এমন পরিস্থিতিতে টেলিভিশনের আলোচনায় নিয়মিত অংশ নেওয়া এবং ট্রাম্পের নীতির পক্ষে কথা বলা জাকারিয়ার নাম সামনে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তার চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলসসহ কয়েকজন উপদেষ্টার কাছে জাকারিয়ার বিষয়ে জানতে চান। সাবেক প্রেস সচিব লেভিটের পরামর্শও নেন তিনি। এরপর ৭ অক্টোবর জাকারিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। পরদিন তিনি ওয়াশিংটনে যান এবং ৯ অক্টোবর ওভাল অফিসে তাদের সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় ট্রাম্প তাকে প্রেস সচিবের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া জানান, প্রেসিডেন্ট নিজেই তাকে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের একটি নির্বাচনী সমাবেশের সময় একই সময়ে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ায় দীর্ঘদিনের কয়েকজন উপদেষ্টার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। তাদের মতে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এমন আচরণ অনুচিত বলে বিবেচিত হতে পারে।
প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
১৩ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন জাকারিয়া। প্রস্তুতির জন্য তাকে ভোর ৩টায় উঠতে হয়েছিল। সংবাদ সম্মেলনের মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে তার বক্তব্যের উপকরণ চূড়ান্ত হয়। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে বারবার থামতে হচ্ছিল এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেও সমস্যায় পড়েন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করেছে কি না-এমন প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারেননি জাকারিয়া। অথচ এ বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। পরে নিজের সংবাদ সম্মেলনের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে এ ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন জাকারিয়া। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে তার দেওয়া উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলোর মধ্যে এটিই ছিল অন্যতম।
আইনজীবী পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
জাকারিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি তার আইনজীবী পরিচয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রকাশ্যে আইন পেশার সনদ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ওই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন।
পরে জাকারিয়া নিজেই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তার দাবি, তাকে বলা হয়েছিল, অ্যাটর্নি না হলেও তিনি নিজেকে ‘লইয়ার’ বা আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বারবার অ্যাটর্নি হিসেবে উল্লেখ করা বিভিন্ন পোস্টে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্ক বাড়ায়।
১৫ অক্টোবর ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টেলিভিশন উপস্থাপক শন হ্যানিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আইনজীবী পরিচয় নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েন জাকারিয়া। এর আগে একাধিক সাক্ষাৎকারেও তাকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যায়। এসব ঘটনার পর তাকে ওই পদে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলাস্কা সফরের ঘটনাতেও বিরক্ত ট্রাম্প
প্রথম সংবাদ সম্মেলনের পর নেতিবাচক সমালোচনা বাড়লেও শুরুতে জাকারিয়ার পারফরম্যান্সকে খুব খারাপ বলে মনে করেননি ট্রাম্প। তবে পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে তিনি বিব্রত হন।
আলাস্কা সফরের সময় আরেকটি ঘটনা ট্রাম্পকে বিরক্ত করে। জাকারিয়া সেখানে ট্রাম্পের জন্য ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের অনুষ্ঠান শেষে আর কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অনীহার কথা তাকে জানানো হয়। এরপরও তিনি পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেন। মঞ্চ থেকে নামার পর বিষয়টি জানানো হলে ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেও ঘটনাটি হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে জাকারিয়ার অনভিজ্ঞতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প পরে উপদেষ্টাদের কাছে মন্তব্য করেন, জাকারিয়া হয়তো এত বড় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তার আইনজীবী পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এবং একের পর এক সমালোচনামূলক সাক্ষাৎকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
পাঁচ দিনের মাথায় দায়িত্ব ছাড়লেন
১৬ অক্টোবর জাকারিয়াকে দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানান ট্রাম্প। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জাকারিয়াকে বলেছিলেন, এই দায়িত্ব তার জন্য উপযুক্ত কি না, তা নতুন করে ভেবে দেখতে। ট্রাম্পের দাবি, জাকারিয়ার এ পদে থাকার প্রয়োজন নেই। দায়িত্ব ছাড়ার আগে জাকারিয়া ধারণা করেছিলেন, ট্রাম্প এখনো তার ওপর আস্থা রাখছেন। শুক্রবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
তবে জাকারিয়ার প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও পছন্দ এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র। শুক্রবার সন্ধ্যায় জাকারিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের বাসভবনে নৈশভোজেও অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে আবারও প্রেস সচিব ছাড়াই চলছে হোয়াইট হাউস। নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো নির্দিষ্ট কোনো নাম জানাননি। তার দাবি, এ পদের জন্য অনেকেই আগ্রহী।
সূত্র: সিএনএন

