প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, অপরাধীদের হাতে অস্ত্র আসছে কোথা থেকে?
রাজধানী থেকে জেলা শহর-দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক গুলির ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। কখনো চায়ের দোকানের সামনে, কখনো মসজিদের পাশে, আবার কখনো নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা হামলাকারীরা খুব কাছ থেকে গুলি ছুড়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ড নতুন করে সামনে এনেছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, অপরাধীদের দুঃসাহস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ।
প্রশ্ন উঠেছে, এত আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধীদের হাতে আসছে কোথা থেকে? কীভাবে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে হত্যাকারীরা? অস্ত্রধারীদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধী চক্রের বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ উদ্ধার না হওয়া উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সীমান্তপথে অস্ত্র চোরাচালান এবং অপরাধী চক্রের মধ্যে অবৈধ অস্ত্রের হাতবদলের অভিযোগও রয়েছে। ফলে অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। খবর বাংলাট্রিবিউনের
কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক গুলি করে হত্যা
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকে’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন।
এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
এই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় গুলি করে হত্যা করা হয় পিয়ারুল সরদারকে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা রয়েছে। সজ্জনকান্দা মধ্যপাড়া মসজিদসংলগ্ন একটি দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। বুকে গুলিবিদ্ধ পিয়ারুলকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একই দিন গভীর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তারেক হোসেন বাপ্পি নামে এক যুবক। এ ঘটনায় তাফসির আলম শাওন নামে আরেক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, অলিনগর এলাকায় অতর্কিত হামলায় দুজন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের হাসপাতালে নেওয়ার পর বাপ্পিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্যের আরেকটি ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় খুলনায়। গত ৫ অক্টোবর রূপসা উপজেলায় আক্তার ঢালী নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর প্রায় ৫০ দিন আগে তাঁর ছেলে জয় ঢালীকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। ছেলের হত্যা মামলার বাদী বাবাকেও গুলি করে হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর এক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, খুলনার দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এদিকে গত ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে খুলনা নগরীর পশ্চিম টুটপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট ও মাস্ক পরা দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন শেখ জুম্মান রহমান বিশাল নামে এক যুবক। গুলি করার পর তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
প্রতিটি ঘটনায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারীদের।
রাজধানীতেও থামছে না লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড
শুধু জেলা শহর নয়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশীনগরে একটি সেলুনে ফরহাদ হোসেন নামে এক যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ জানায়, নিহত ফরহাদ মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারকেন্দ্রিক একটি অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এর আগে ১২ জুন রাজধানীর রামপুরা-হাতিরঝিল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজারে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তিও গুলিবিদ্ধ হন।
৯ মাসে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে মামলা হয়েছে ৮৮১টি। বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।
এত অস্ত্র আসছে কোথা থেকে?
একের পর এক গুলির ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন অস্ত্রের উৎস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অবৈধ অস্ত্রের কয়েকটি সম্ভাব্য উৎস সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তপথে চোরাচালান, অপরাধী চক্রের কাছে আগে থেকে থাকা অস্ত্রের হাতবদল এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩০৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। শুধু অস্ত্র নয়, একই সময়ে লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি উদ্ধার হয়নি।
দুই বছরের বেশি সময় পরও বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব অস্ত্রের সবই যে অপরাধীদের হাতে রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। তদন্তে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধী চক্রের কাছে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামে গত আগস্টে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের অভিযানে পুলিশের দিকে ছোড়া গুলিতে ব্যবহৃত পিস্তল পরীক্ষা করে সেটি ২০২৪ সালে কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ঢাকার মিরপুরেও উদ্ধার হওয়া একটি বিদেশি পিস্তলের সঙ্গে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। ফলে লুট হওয়া একটি অস্ত্র কতবার হাতবদল হয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
অন্যদিকে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ দেশের বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি রুট সক্রিয় এবং কোন পথে কী পরিমাণ অস্ত্র প্রবেশ করছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান, তবু কেন শঙ্কা?
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা জানালেও উদ্ধার না হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সম্প্রতি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি)। অস্ত্রের সন্ধানদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
‘আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি হত্যার অন্যতম কারণ’
ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রভাব খাটানোর প্রবণতা থেকে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিপক্ষের কেউ কেউ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।’
তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। এসব অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আল বলেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এখন অনেক কঠিন কাজ। এসব অস্ত্র উদ্ধারে নতুন করে এসআরবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও আশানুরূপ সফলতা দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কাছে ছোট আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। সেগুলোর অনেকগুলো উদ্ধার হচ্ছে না। ফলে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটছে। সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু এই চেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।’
যা বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে অস্ত্র উদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’
রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে।’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।’ সূত্র: বাংলাট্রিবিউন।

