খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন: যেভাবে গৃহবধূ থেকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হয়ে উঠলেন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে আপোষহীন নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষের ভরসার প্রতীক। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতার বাইরে থেকেও সংগ্রাম-সব মিলিয়ে তার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বিএনপি মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে ভারতের জলপাইগুড়িতে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলে। তার বাবার আদি নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামে।
শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন
১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন খালেদা জিয়া। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। কলেজে অধ্যয়নকালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘স্বশিক্ষিত’ উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় আসেন এবং বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় অবস্থান করেন। ২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা তাকে ও তার দুই সন্তানকে আটক করে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন।
রাজনীতিতে আগমন
স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না খালেদা জিয়া। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার পর দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে তিনি বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। নীতি ও আদর্শে আপসহীন অবস্থানের কারণে দ্রুতই তিনি ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে প্রথমবার, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোট সরকারের প্রধান হিসেবে তৃতীয়বার তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান।
বিএনপির নেতৃত্ব
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর একাধিক জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পুনরায় এই পদে নির্বাচিত হন এবং টানা প্রায় ৪১ বছর দলটির নেতৃত্ব দেন।
আন্দোলন-সংগ্রাম
এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আপসহীন আন্দোলন। ১৯৮৩ সালে তার নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট গঠিত হয়। কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতেও দলের নেতৃত্ব দেন।
অনন্য রেকর্ড
নির্বাচনী রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে। তিনি পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই বিজয়ী হন।
কারাবাস ও আইনি লড়াই
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাস ও একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যান তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালে পুনরায় কারাগারে যান। পরে নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পান।
শেষ দিনগুলো
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান হলো।

