সিম ট্যাক্স মওকুফের সুবিধা সরাসরি গ্রাহককে দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
টেলিকম খাতে কর বা ফি কমানোর সুফল যাতে সরাসরি সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
তিনি বলেছেন, সিম ট্যাক্স মওকুফের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা দেওয়া। তাই সরকারের দেওয়া কর ছাড়ের সুবিধা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ-টিআরএনবি আয়োজিত ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেক্টেড বাংলাদেশ: এনাবলিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ তুলে উপদেষ্টা বলেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে সরকারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব পড়েছে। এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ সুবিধা কী হবে এবং সেবার মান কতটা বাড়বে-এসব বিষয় সরকারকে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে হয়েছে।
সিম ট্যাক্স মওকুফের পর সাধারণ গ্রাহকরা এর পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন কি না-এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও টেলিটকের মতো অপারেটররা সিদ্ধান্তটি কীভাবে বাস্তবায়ন করছে, তা জানতে তাদের সঙ্গেও আলোচনা প্রয়োজন। এক-দুই মাসের তথ্য দিয়ে এর পূর্ণ সুফল মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্পেকট্রামের মূল্য পুনর্বিন্যাস ও কর ছাড়ের সুফল দ্রুত সেবার মান বৃদ্ধি এবং কম খরচের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছাবে।
স্পেকট্রামের মূল্য পুনর্বিন্যাসের তাগিদ
গোলটেবিল বৈঠকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী দেশের স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের প্রচলিত পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক তুলনামূলক মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে তা পুনর্বিন্যাসের তাগিদ দেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কথা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বোচ্চ দরকে ভিত্তি করে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে।
স্পেকট্রামের বিষয়টি বোঝাতে পানির পাইপের উদাহরণ দিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ মোটা পাইপের মতো—এতে বেশি তথ্য পরিবহন করা যায়, তবে দূরত্ব কম অতিক্রম করে। অন্যদিকে কম ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ চিকন পাইপের মতো-তথ্য পরিবহনের সক্ষমতা কম হলেও বেশি দূরত্বে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল সেবার সময়ে মূলত ভয়েস কলের ওপর গুরুত্ব থাকায় কম ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ দিয়েই কাজ চালানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল সেবায় বিপুল পরিমাণ তথ্য পরিবহনের প্রয়োজন হওয়ায় বেশি ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে একই অবকাঠামোয় সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার মতে, অপারেটরদের হয় টাওয়ারের সংখ্যা বাড়াতে হবে, নয়তো অতিরিক্ত স্পেকট্রাম কিনতে হবে। আর এখানেই স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কম দামে স্পেকট্রাম দেওয়ার পক্ষে অপারেটররা
মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের সভাপতি ও রবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা বলেন, স্পেকট্রামের মূল্য শুধু সরকারের রাজস্ব দিয়ে বিচার করলে হবে না। অতিরিক্ত মূল্য নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের অর্থ কমিয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহকসেবায় পড়বে।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়োহান বুসে সাশ্রয়ী মূল্যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ হলে নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ এবং সেবার মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন।
গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান বলেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় স্পেকট্রাম নবায়নের অর্থনৈতিক কাঠামো এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও মানসম্মত সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বজায় থাকে।
মূল প্রবন্ধে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মুনির হাসান বলেন, দীর্ঘদিন স্পেকট্রাম নীতিতে রাজস্ব আহরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় উচ্চমূল্য, সীমিত স্পেকট্রাম ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৩তম।
তিনি বলেন, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে নেটওয়ার্ক অর্থনীতি, ব্যবসায়িক মূল্য ও আন্তর্জাতিক তুলনামূলক মূল্য—এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
মুনির হাসানের মতে, অব্যবহৃত স্পেকট্রামের অর্থনৈতিক মূল্য সীমিত। আবার অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করলে অপারেটরদের মূলধনের বড় অংশ ফি পরিশোধে চলে যেতে পারে। সাশ্রয়ী মূল্যে বেশি স্পেকট্রাম ব্যবহারের সুযোগ দিলে নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ, সেবার মান এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার আরও দ্রুত হতে পারে।
টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিটিআরসি, এমটব, মোবাইল অপারেটর ও টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় সাশ্রয়ী ডিভাইস, পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও মানসম্মত সংযোগকে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির চারটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

