দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সদস্য সোয়া ৪ হাজারের বেশি
দেশজুড়ে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা সোয়া ৪ হাজারের বেশি। রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ১৫৯টি গ্যাং, আর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সক্রিয় আরও ২২৭টি গ্যাং।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, হামলা, দখল ও আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিজেদের আধিপত্য নিয়ে গ্যাংগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে ২২৭টি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ে সদস্য রয়েছে ২ হাজার ৫৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৮টি গ্যাং রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরে। এ ছাড়া খুলনায় ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হিসাবে রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাংয়ে সদস্য রয়েছেন ১ হাজার ৮১২ জন। রাজধানীর মধ্যে মোহাম্মদপুরে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্যাং রয়েছে, যেখানে সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৩০০-এর বেশি। পল্লবী থানা এলাকায় রয়েছে ১৬টি গ্যাং।
অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই ও মাদক কারবারের অভিযোগ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোথাও কোথাও চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে গ্যাং সদস্যরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের আয়ের অন্যতম উৎস মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় অংশ নেওয়া।
সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে জোর করে গলিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং পরে ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাকে খোঁজার অভিযোগ ওঠে কয়েকজন তরুণের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত কিশোর গ্যাংয়ের এমন তৎপরতা দেখা যায়।
মোহাম্মদপুর, পল্লবী ও খিলগাঁওয়ে বেশি তৎপরতা
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, খিলগাঁও, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি।
মিরপুর বিভাগের সাত থানা এলাকায় রয়েছে ৩৫টি গ্যাং। এর মধ্যে শুধু পল্লবী থানা এলাকাতেই ১৬টি গ্যাং সক্রিয়। দারুসসালামে রয়েছে ৬টি, শাহআলীতে ৪টি এবং মিরপুরে ৩টি গ্যাং।
খিলগাঁও এলাকায় বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে বেশির ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
কেন বাড়ছে কিশোর গ্যাং
পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকদের উদাসীনতা, অসৎ সঙ্গ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকের বিস্তার, মূল্যবোধের সংকট, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং কিশোরদের মধ্যে প্রভাব ও বাহাদুরি দেখানোর প্রবণতা।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ায় তারা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছিল। তবে বর্তমানে পুলিশের অভিযান ও আইনগত পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনার তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মহীন কিশোরদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থে কোনো কোনো ‘বড় ভাই’ বা পৃষ্ঠপোষকের ব্যবহারও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তার মতে, শুধু কিশোরদের শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা সুবিধাভোগী ও পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পুলিশ বলছে, কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো গেলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব । সূত্র; সমকাল

