তরুণ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যবসার ভালো ধারণা থাকলেও পুঁজি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে উদ্যোগ নিতে পারছেন না—এমন তরুণদের পাশে দাঁড়াতে ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কর্মসূচির আওতায় সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচিটির বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। এ সময় সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগানো জরুরি। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের একটি অংশকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তাঁরা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের অন্যতম বড় লক্ষ্য আগামী দেড় বছরের মধ্যে দেশে ও দেশের বাইরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা। এ লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী পর্যায়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ কর্মসূচির পূর্ণ নাম ‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’। এর ইংরেজি নাম ‘আপজিলা ড্রিভেন ইয়ুথ অপরচুনিটি ফর গ্রোথ (উদ্যোগ)’।
কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে তাঁদের ব্যবসায়িক ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রাথমিকভাবে আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হবে। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে নির্বাচন করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য উপজেলাতেও কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। প্রতিবছর ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, অতীতে তরুণদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের অনেকটাই ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। অথচ গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক তরুণের বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা রয়েছে। প্রাথমিক মূলধন, সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্যের অভাবে তাঁদের অনেকেই উদ্যোগ নিতে পারেন না। ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির মাধ্যমে এসব বাধা দূর করার চেষ্টা করা হবে।
এ কর্মসূচিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা খাতের সীমাবদ্ধতা থাকবে না। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, প্রযুক্তিসহ বৈধ ও সম্ভাবনাময় যেকোনো ব্যবসায়িক ধারণা বিবেচনায় নেওয়া হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আগের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকাও বাধ্যতামূলক নয়। গুরুত্ব দেওয়া হবে বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণাকে।
সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিক, যাঁদের বয়স আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে ২৮ বছরের বেশি নয়, তাঁরা এ কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন। আবেদনের জন্য কোনো ফি লাগবে না। নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করা যাবে।
তবে ২০ লাখ টাকার পুরো অর্থ শুরুতেই অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে না। আরিফ হোসেন খান জানান, প্রথমে পুরো অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। উদ্যোক্তা ব্যবসা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এবং ঋণের অর্থ ফেরত দেওয়ার পর মোট অর্থের ৫০ শতাংশ অনুদান হিসেবে বিবেচিত হবে। বাকি ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ব্যবসা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে অনুদানের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, শুধু অর্থায়ন করেই উদ্যোক্তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। তাঁদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক বিষয়ে ধারণা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। প্রয়োজনে বাজারজাতকরণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেওয়া হবে। ব্যবসা নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমেও সহযোগিতা করা হবে।
উদ্যোক্তাদের জন্য মেন্টরশিপের ব্যবস্থাও রাখা হবে। জাতীয়ভাবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচিতে রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো সুযোগ থাকবে না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তবে কোনো সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তাঁকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া হবে না। মূল বিবেচনা হবে তাঁর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়া।
কর্মসূচির অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে শুরু থেকেই নজরদারি থাকবে বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচিটি পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি বিভাগীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম এবং অর্থের ব্যবহার তদারকি করবে।
ঋণের অর্থ অপব্যবহার বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, অর্থ নিয়ে নয়-ছয় করার সুযোগ থাকবে না। কেউ ঋণ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যবহার করলে তাঁকে প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন ঋণ কর্মসূচিতে অনিয়ম ও অপব্যবহারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, নতুন কর্মসূচিতে তার পুনরাবৃত্তি করতে চান না তাঁরা। সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন ও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে অর্থের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি সম্ভাবনাময় তরুণদের ওপর আস্থা রেখে তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য তরুণদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। শুধু চাকরি পাওয়ার চিন্তা না করে তাঁদের একটি অংশ যাতে চাকরি দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের চিন্তা করেন, সেটিই এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। সবাই উদ্যোক্তা হতে পারবেন না। তবে যাঁদের মধ্যে সম্ভাবনা, নতুন কিছু করার আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে, তাঁদের খুঁজে বের করে সুযোগ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তরুণরা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বিদেশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কঠিন পরিবেশে কাজ করে তরুণ শ্রমিকেরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কর্মসূচির বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের দিকে সার্কুলার জারি হতে পারে। সার্কুলার জারির পর এক মাস আবেদন গ্রহণ করা হবে। এরপর যাচাই-বাছাই ও নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।

