অবৈধ মোবাইল ফোন: অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য নীরব হুমকি

এস এম ফয়েজ , সিনিয়র সাংবাদিকএস এম ফয়েজ , সিনিয়র সাংবাদিক
প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহন, নভম্বর ২৩, ২০২৫

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য ‘আনঅফিশিয়াল’ বা অবৈধ পথে আমদানিকৃত মোবাইল হ্যান্ডসেট এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ‘গ্রে মার্কেট’ কেবল সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে না, বরং দেশের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় শিল্প বিকাশের জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করছে।

অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে থাকা প্রায় ৬০ শতাংশ মোবাইল ফোনই অবৈধভাবে প্রবেশ করে। এর ফলে প্রতি বছর সরকার আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি দেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের রক্তক্ষরণ। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এসব ফোন কম মূল্যে বিক্রি হওয়ায় বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। এর ফলে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং অনেক কারখানা অস্তিত্ব সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন

আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অবৈধ মোবাইল ফোনগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এসব ফোনের কোনো সঠিক নিবন্ধন থাকে না, অনেক ক্ষেত্রে আইএমইআই (IMEI) নম্বর জাল করা হয় বা ক্লোন করা হয়। ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যেমন: মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) জালিয়াতি, সিম প্রতারণা এবং চুরি হওয়া ফোন ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি ফোনের বৈধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

প্রতিকার ও করণীয়

সরকার অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালু করার মতো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল বৈধভাবে আমদানিকৃত বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও নিবন্ধিত হ্যান্ডসেটগুলোই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকতে পারবে। এটি একটি সঠিক উদ্যোগ, তবে এর বাস্তবায়নে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:

Nagad

স্বচ্ছতা ও কঠোর প্রয়োগ: এনইআইআর সিস্টেমটি যেন কোনো সিন্ডিকেটের স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শুল্ক পুনর্বিবেচনা: বৈধ ফোনের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে আমদানি শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

জনসচেতনতা: অবৈধ ফোন কেনা থেকে বিরত থাকতে গ্রাহকদের সচেতন করতে হবে এবং কেনার সময় ফোনের বৈধতা যাচাইয়ের পদ্ধতি সহজলভ্য করতে হবে।

অবৈধ মোবাইল ফোনের বাজার বন্ধ করা কেবল সরকারের একার কাজ নয়, এটি নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। এই নীরব হুমকি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ না করলে, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

লেখক: এস এম ফয়েজ , সিনিয়র সাংবাদিক