কেন লাখো তরুণের অনুপ্রেরণা ওসমান হাদি? সংক্ষিপ্ত জীবনে বিস্তৃত প্রভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক:নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহন, december ২০, ২০২৫

শরীফ ওসমান হাদি। ফাইল ছবি

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজা আজ শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করার কথা রয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটিই প্রশ্ন-কে এই ওসমান হাদি, কেন এত অল্প সময়েই তিনি তরুণদের আইকনে পরিণত হলেন?

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে শরিফ ওসমান হাদি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। জুলাই শহীদদের অধিকার আদায়, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তার হত্যাকাণ্ডে শোকাহত গোটা দেশ।

১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শরিফ ওসমান হাদি। তার বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন মাদরাসা শিক্ষক। সীমিত আয়ের পরিবারে, টিনশেডের ছোট ঘরে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেটেছে হাদির শৈশব। মা তাসলিমা হাদির ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শৈশব থেকেই অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন হাদি।

তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায়। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা শেষে তিনি ভর্তি হন ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায়। সেখান থেকে দাখিল ও আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও সক্রিয় ছিলেন হাদি। ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে তিনি কবিতা লিখতেন। তার লেখায় শোষণ, নিপীড়ন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালে দুয়ার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’, যা পাঠকমহলে আলোচিত হয়। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট।

পেশাগত জীবনে হাদি ইংরেজি শেখানোর একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। পরে তিনি ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই সময় ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং রামপুরা এলাকার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।

Nagad

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হাদিকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল-সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধীদের বিচার, আহত ও নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন।

ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও স্লোগান কর্মসূচি, শহীদি সপ্তাহ পালন, অনশন, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ভিডিও ডকুমেন্টেশন, শহীদি স্মৃতিকথা পাঠ, গণসেজদা ও দ্রোহের গানসহ নানা ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করা হয়।

২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধের দাবিতে ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও ইনকিলাব মঞ্চ সক্রিয় ভূমিকা রাখে। এই আন্দোলনে হাদি আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দলটিকে দায়ী করে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান। দাবি আদায় না হলে সচিবালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণাও তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম নিয়েও সরব ছিলেন হাদি। কাঠামোগত দুর্বলতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের অভাবের সমালোচনা করে তিনি সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

রাজনৈতিক জীবনের এক পর্যায়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাও দেন ওসমান হাদি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর) থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, ‘চা–সিঙাড়া’ আড্ডা এবং জনমতের ভিত্তিতে ইশতাহার তৈরির কথা জানান।

নির্বাচনি প্রচারণায় মুড়ি-বাতাসা বিতরণ, ফজরের নামাজের পর লিফলেট বিলি, ডোনেশনের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খরচের হিসাব প্রকাশ—এসব ব্যতিক্রমী উদ্যোগ তাকে তরুণদের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। প্রচারণার সময় পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

টিনশেডের ঘর থেকে উঠে এসে অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই তরুণ নেতাই অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন অসংখ্য তরুণের প্রেরণা-ওসমান হাদি।