৯ এনবিএফআই বন্ধের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক, ঝুঁকিতে হাজার কোটি টাকা

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫:৫০ অপরাহন, জানুয়রী ২২, ২০২৬

অব্যবস্থাপনা ও বিপুল খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত ৯টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ খবরে বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক মাস আগে পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার একযোগে শূন্য হয়ে যাওয়ায় শতশত বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হন। সেই ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে ৯টি এনবিএফআই বন্ধের সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে আবারও অনিশ্চয়তা ও ভীতির জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-এফএএস ফিন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস।

এই নয়টির মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। ফলে বিপুলসংখ্যক সাধারণ বিনিয়োগকারীর অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে রয়েছে। শেয়ারের অভিহিত মূল্য অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে থাকা মূলধনের পরিমাণ প্রায় এক হাজার আট কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক ও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে তাদের আর্থিক অবস্থা, সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ এবং আমানত ফেরতের বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এই শুনানিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে অবসায়ন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত তথ্য জানানো, সরকারি কোনো ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা থাকলে বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা, শেয়ার মূল্যের ক্ষেত্রে অভিহিত বা বাজারমূল্যের যেটি বেশি সেটিকে ন্যূনতম পাওনা হিসেবে গণ্য করা এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি বাতিল না করার দাবি জানানো হয়।

তবে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সময়ও বিএসইসি একই ধরনের চিঠি দিয়েছিল। এরপরও বিনিয়োগকারীদের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার শেয়ারমূল্য এক ঝটকায় শূন্য হয়ে যায়।

Nagad

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবলুপ্ত হলেও কোনো আমানতকারী টাকা হারাবেন না। সবাই সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, এরপর মধ্যম ও বড় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে রয়েছে। এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির মালিক প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু প্রতিষ্ঠান একীভূত বা পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা করলেও ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরতের জন্য সরকার প্রায় এক হাজার পাঁচশ কোটি টাকা সরবরাহ করবে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বড় অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল মূল টাকা ফেরত দিয়ে মুনাফা না দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ন্যায্য ও স্বচ্ছ সমাধান না এলে ভবিষ্যতে আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এনবিএফআই খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের দখলে। গত অর্থবছর শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আটকে থাকা মোট আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যক্তিগত আমানত ৩ হাজার ৫২৩ কোটি এবং ব্যাংক ও করপোরেট আমানত ১১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বড় অংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। পিপলস লিজিংয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৭২ দশমিক ৯৪ শতাংশ, এফএএস ফিন্যান্সে ৭৯ দশমিক ২৫ শতাংশ, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৫৮ দশমিক ১০ শতাংশ, জিএসপি ফিন্যান্সে ৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ফারইস্ট ফিন্যান্সে ৪৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন—আগের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হলে তারা কি আবারও সর্বস্ব হারাবেন? প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হলে তারা কি ন্যায্য পাওনা পাবেন, নাকি শেয়ার ও মূলধন এক ধাক্কায় শূন্য হয়ে যাবে? ন্যায্য ও স্বচ্ছ সমাধান ছাড়া পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরবে কি না, সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।